ভোট বিপ্লবঃ সরকার গঠনে এগিয়ে থাকা জোট

নজরুল ইসলাম (বিশেষ ইনসাইড)- সোস্যাল মিডিয়া স্পেশালিষ্ট ও সাংবাদিক, মাইন্স-জার্মানি

6 Min Read
Highlights
  • ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬
  • ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ

অনিশ্চয়তার সব দিকের সমাপ্তি টেনে নিরব ভোট বিপ্লবের দিকে আগামীর বাংলাদেশ। যেখানে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জবাব দিবে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ। গণতন্ত্রের তৃষ্ণায় ক্লান্তিতে ধুঁকা এই জাতির ভবিষ্যৎ শুধু মাত্র একটি ভোটের উপর নির্ভর করছে।

ঠিক কথা বলছি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ প্রসঙ্গে। ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ৫ই আগষ্ট ২০২৪ স্বৈরাচার হাসিনার সরকার পতনের পর বিএনপি বাংলাদেশে একক রাজনৈতিক সুবিধা পেয়ে যায়। সাধারণ জনগণ কল্পনাও করতে পারেনি বিএনপি বাদে বিকল্প কোনো দল বা জোট ক্ষমতায় আসবে। সর্বত্র ছিল বিএনপির জয় জয়কার অবস্থা। কিন্তু, সময়ের কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ক্ষমতা আসার পথে বড় চ্যালেঞ্জ এখন জামায়াত-এনসিপি-চরমোনাই জোট।

২০২৫ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক গুলো জরিপ পরিচালিত হয়। তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য  হচ্ছে, মার্কিন ফেডারেল সরকারের অর্থায়নে রিপাবলিকান পার্টি-ঘনিষ্ঠ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই), ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম, বেসরকারি সংস্থা এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) ও প্রথম আলো নির্বাচন জরিপ। প্রথম তিনটি ইনস্টিটিউট বা সংস্থার জরিপের ফল প্রায় কাছাকাছি। যেখানে বিএনপি শরিক ও জামায়াত-এনসিপি জোটের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা মধ্যে প্রায় তেমন কোনো পার্থক্য নেই। সামষ্টিক ভাবে বলতে গেলে বিএনপি শরিক জোটের চেয়ে জামায়াত-এনসিপি জোট ক্ষমতায় আসা সম্ভাবনাতে অনেক বেশি এগিয়ে। যদিও ইএএসডি ও প্রথম আলোর নিজস্ব জরিপের ফলাফলে তুলে ধরা হয় বিএনপি শরিক জোটের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি। তবে এই দু’জরিপ নিয়ে জনমনে বিস্তর সংশয় ও প্রশ্ন আছে।

বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভেশন কনসাল্টিং এর ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে রাউন্ড টু’-এর দ্বিতীয় অংশের ফলাফল তথ্য মতে,  ৬৫.৫ শতাংশ ভোটার দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে প্রার্থী বিবেচনায় ভোট দিতে আগ্রহী। মাত্র ১৪.৭ শতাংশ ভোটার প্রতীক দেখে ভোট দেবেন। এই বিষয়টি আসন্ন সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর গুলোর একটি। যেখানে প্রতীকের চেয়ে প্রার্থী নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের তরুণেরা এই বিষয়ে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। আগামী নির্বাচনে দলের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের মতো ধারণার পরিবর্তন দেখতে পাবে রাজনৈতিক দল গুলো।

স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের কার্যক্রমে সব চেয়ে বেশি সন্তুষ্ট সাধারণ মানুষ। ইনোভেশন কনসাল্টিং সার্ভের তথ্য বলে, বিএনপির কার্যক্রমে সন্তুষ্ট ৮.২ শতাংশ, জামায়াতের ১৩.৭ শতাংশ এবং এনসিপির কার্যক্রমে সন্তুষ্ট ৯.১ শতাংশ ভোটার। সামষ্টিক ভাবে সাধারণ জনগণ বিএনপি ও শরিক জোটের চেয়ে  জামায়াত-এনসিপি জোটের কার্যক্রমের প্রতি বেশি আস্থা রাখতে চাই। জরিপের বাহিরের চিত্র আরো বেশি জামায়াত-এনসিপি জোটের পক্ষে যাচ্ছে। যেখানে ৫ই আগষ্টের পর বিএনপির কর্মকাণ্ডের উপর স্বয়ং বিএনপির কর্মী সমর্থকেরাও অনেক বেশি বিরক্ত।

তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অভিযোগ করে আসছে  বিএনপি প্রধান তারেক রহমান দেশে আসার পর থেকে পুরো সরকার ও নির্বাচন কমিশন বিএনপির গুলশান অফিসে পরিনত হয়েছে। সরকারি কর্মকতারা রীতিমতো বিএনপির তাবিদারি করছে। নির্বাচন কমিশন বিএনপির সুরে কথা বলছে। নমিনেশনপত্র যাচাই বাচাইয়ের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিএনপির প্রার্থীর নমিনেশনপত্র বৈধতার ঘোষণা আসলে ঘোষণা কক্ষে দায়িত্বে থাকা অফিসারদের হাতের তালি দেওয়ার মতোও ঘটনা ঘটেছে। যা রীতিমতো বিএনপির এজেন্ট হয়ে কাজ করার সামিল।

এই সমস্ত কার্যক্রম বিবেচনা করে অনেকে ধারণা করছেন বিএনপি আগামীতে খুব সহজে ক্ষমতায় চলে আসছে। না হলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন সর্বত্র নিরপেক্ষ আচরণ করার কথা ছিল। তবে এই পক্ষপাতী আচরণ যে কোনো মূহুর্তে ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে যাওয়ার মতো আশঙ্কা করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ জনগণ। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতার আসনে বসা ড. ইউনুস সরকারের উপর তারা আস্থা হারাতে চাচ্ছেন না। তারা মনে করছেন ইউনুস সরকার বিএনপির প্রতি পক্ষপাতিত্ব আচরণ করে নির্বাচনের সময় ঠিকই আচরণ পরিবর্তন করে ফেলবেন। যা বিএনপির জন্য একটা ফাঁদ হতে পারে।

এই ফাঁদের পিছনে কিছু যুক্তি কাজ করে। ধারণা করা হচ্ছে রাজনৈতিক মাঠ শান্ত রাখা ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এমন কৌশল অবলম্বন করা হতে পারে। যেখানে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অন্যান্য দল গুলোকে মাঠ গোছানোর জন্য সুযোগ  দেওয়া হচ্ছে। বিএনপিকে অতি কনফিডেন্সে রেখে রাজনৈতিক ভাবে দূর্বল করার কৌশল হতে পারে। এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যখন স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রতি বিএনপির চেয়ে বেশি সাধারণ জনগণের আস্থা বাড়ে।

পাশাপাশি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যমূলক আচরণে মারাত্মক অতিষ্ঠ। বিপরীত দল ও মতের মানুষের উপর নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও ক্ষমতার বাজে প্যাক্টিসের মতো বিষয় গুলোও সাধারণ মানুষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। পুনরায় স্বৈরাচারের জন্মের বিষয়ে তাদের মারাত্মক ভীতি ও শঙ্কা আছে। হাত বদলের রাজনীতি চর্চার বাহিরে সাধারণ জনগণ এখন একটি জনবান্ধন, ইনসাফ ও সাম্যের শাসন ব্যবস্থা চাই।

তবে যায় বলি না কেনো আসন্ন নির্বাচন যে রাজনৈতিক দল গুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ নির্বাচন হবে তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ জনগণ যে তাদের পছন্দের সরকার বসাবে এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তারা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি  রাজনৈতিক সচেতন। যদি সরকার ও নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারে, তাহলে এই সচেতনতা তৈরি করবে নতুন বাংলাদেশ। ঘটবে ভোট বিপ্লব।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *