৩য় পর্বের পর থেকে…
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গুপ্তছড়া ঘাটকেন্দ্রিক আর্থিক কার্যক্রমে ছাত্রদল নেতা শহিদ ও তার ঘনিষ্ঠ অনুসারী আমিন রসুল এককভাবে নয়, বরং স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী একটি বলয়ের ছত্রচ্ছায়ায় কাজ করেছেন। একাধিক সূত্রের দাবি, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলমগীর ঠাকুরের সঙ্গে শহিদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তিনি ঠাকুরের বিশ্বস্ত অনুসারী হিসেবে পরিচিত। সহজ করে বললে শহিদ ও আমিন রসুল অনেকটা ঠাকুরের অন্ধকার জগতের সহযোদ্ধা।
অনুসন্ধানে উপজেলা বিএনপির আরেক নেতা হাসানুজ্জামান মামুন চেয়ারম্যানের (প্রকাশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অব সন্দ্বীপ) নামও এসেছে। কয়েকটি সূত্রের দাবি, একসময় কাউন্টার থেকে তার নামেও নিয়মিত অর্থ উত্তোলনের কথা বলা হতো। তবে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে মামুন চেয়ারম্যান প্রকাশ্যে দাবি করেন, তিনি এ ধরনের কোনো অর্থ গ্রহণ করেননি।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, ঘাট থেকে সংগৃহীত অর্থের মাধ্যমে আলমগীর ঠাকুর ও মামুন চেয়ারম্যান দু’ভাবে বেনিফিশারি হয়েছেন। এক. প্রত্যক্ষ গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিদিষ্ট একটি পারসেন্টেজ গ্রহণ করে। দুই. কর্মীদের সম্মানির মাধ্যমে সাংগঠনিক প্রভাব ধরে রাখতে ব্যবহার করে, যা সন্দ্বীপের রাজনীতিতে ঘাট কেন্দ্রীক বা এর বাহিরে শহিদ ও আমিন রসুলের মাধ্যমে শক্ত একটা বলয় তৈরি করা যায়। উভয় ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির নেতাদের চাপের মুখে শহিদ এক পর্যায়ে স্বীকারও করে নিয়েছে, তাকে চাঁদাবাজি ও আত্মসাৎতের টাকার একটা নিদিষ্ট অংশ মামুন চেয়ারম্যান ও ঠাকুরের বলয়ে দিতে হয়েছে।
অন্যদিকে অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, দলীয় নেতাদের সঙ্গে একাধিক আলোচনায় শহিদ বলেছেন,
সব দোষ তো আমাকে দিলে হবে না। এই টাকা গুলো কি আমি একা হজম করেছি? আমাকে কি ঠাকুর ও মামুন চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করতে হয় নাই?
এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপি এক যুন্ম-আহ্বায়ক বলেন,
শহিদ এই টাকা একা হজম করার মতো ছেলে নয়। তাকে অবশ্যই ভাগ দিতে হয়েছে। সে গুপ্তছড়া ঘাট থেকে টাকা গুলো আকাশে উড়ায় দিতো। পরে ঠাকুরের কাচারিতে সেটা অবতণ করতো।
অনুসন্ধান আরো গভীরে যেতে চাই। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা থেকে বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট হওয়া যাবে।
ঘটনা–১: সাম্প্রতিক সময়ে গুপ্তছড়া ঘাটে সিমেন্ট বহনকারী একটি মালের বোটকে কেন্দ্র করে একটি ঘটনা ঘটে। জানা যায়, চট্টগ্রামের ডায়মন্ড কোম্পানি থেকে আনা ১ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট দিনের জোয়ারে সন্দ্বীপ উপকূলে পৌঁছায়। খালে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় রাতের জোয়ারের অপেক্ষায় বোটটি নদীর কূলে নোঙর করে রাখা হয়। সিমেন্টগুলো তালতলীর রিপন চেয়ারম্যানের বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বোটটির মালিক ছিলেন তালতলীর মোবারক ও ইয়াসিন সওদাগর।
অভিযোগ রয়েছে, বোটে অবৈধ মালামাল রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে শহিদ ও আমিন রসুলের নেতৃত্বে প্রায় ২০ জনের একটি দল রাতে বোটটি আক্রমণ করে। এ সময় বোটে থাকা ছয়জনকে প্রচুর মারধর করা হয়। আহত কয়েকজনকে পরে সন্দ্বীপের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, মেঘনা অয়েল কোম্পানি থেকে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা পাঁচ ড্রাম তেল বোট থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিটি ড্রামের মূল্য ছিল ২২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকার তেল নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে এসব তেল ঘাটে থাকা বলগেট চালকদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
এছাড়া পুরো বোটটি আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বোট ছাড়াতে পরদিন আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে সন্দ্বীপ কমপ্লেক্সের ইসলামী ব্যাংক থেকে নগদ ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করে বোটের সেরাং (মাঝি) ঘাটসংলগ্ন কেরবা বা কেওড়া বাগানে শহিদ ও আমিন রসুলের হাতে তুলে দেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থের একটি অংশ আলমগীর ঠাকুর ও মামুন চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছায়। এ বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কাজ চলমান রয়েছে।
ঘটনা–২: ১৫ মার্চ রাত ১০টার দিকে এনাম নাহার মোড়ে আড্ডা ক্যাফেতে সুমন নামে এক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, শহিদের ঘনিষ্ঠ আমিন রসুলের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি এ হামলায় অংশ নেয়।
অনুসন্ধান টিমের হাতে আসা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ক্যাফের ভেতরে বসে থাকা সুমনকে মারধর করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারালে তাকে আলমগীর ঠাকুরের বাড়ির সামনের কাচারিতে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সূত্রগুলোর দাবি, তাজ ইটভাটায় ব্যবহৃত একটি ভেকু মেশিনের ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে এই ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগ অনুযায়ী, পাওনা ভাড়া না পেয়ে সুমন মেশিনটি ইটভাটা থেকে নিয়ে আসেন। এরপর সৃষ্ট বিরোধের জেরে তার ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনা–৩: ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন তাজ ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ আলমগীর ঠাকুর, মামুন চেয়ারম্যান ও শহিদ গংয়ের হাতে যায়।
৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মগধরা ইউনিয়ন পরিষদ ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য তাজ ইটভাটার ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করে, যেখানে মালিক হিসেবে আনোয়ার হোসেনের নাম উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ২৪ জুলাই ২০২৬ ঘোষিত সন্দ্বীপ ইটভাটা মালিক সমিতির কমিটিতে মামুন চেয়ারম্যান সভাপতি, শহিদুল ইসলাম শহিদ সাংগঠনিক সম্পাদক এবং আলমগীর ঠাকুর সদস্য নির্বাচিত হন। এ বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনা–৪: ২২ এপ্রিল ২০২৬ সন্দ্বীপ উপজেলা ইউএনও কার্যালয়ে স্পিডবোট ভাড়া নির্ধারণসংক্রান্ত একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, স্পিডবোট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আদিল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জগলুল হোসেন নয়ন, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় স্পিডবোট মালিকপক্ষ জনপ্রতি ৩৫০ টাকা ভাড়া প্রস্তাব করলেও উপস্থিত অনেকেই ২৫০ থেকে ২৮০ টাকার মধ্যে ভাড়া নির্ধারণের পক্ষে মত দেন। আলমগীর ঠাকুর মাঝখান থেকে স্পিডবোট ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দেন। শুধু প্রস্তাব দিয়ে বসে থাকেন নি, বরং ইউএনওকে তার প্রস্তাবিত ভাড়া নির্ধারণে ডিসির বরাবর সুপারিশ করতে রীতিমতো চাপ প্রয়োগ করেন। অনেকটা নিজের একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন সন্দ্বীপবাসীর উপর। এই সিদ্ধান্তকে সন্দ্বীপের মানুষ ঠাকুরের মঞ্চত্ব নাটক বলে অবহিত করেন। কেননা এই প্রস্তাবনা সম্পূর্ণ রুপে স্পিডবোট মালিকের পক্ষে ছিলো, যা ঠাকুরদের পরিকল্পনাতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন সচেতন মহল ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।
চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাৎতের বিষয়ে অনুসন্ধান টিম ইজারাদার জগলুল নয়নের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন,
এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না। আমি চাই ব্যবসাটা চালিয়ে নিতে। তখন যা হয়েছে সেটা ছিলো ব্যবসায় ইনভেস্টমেন্ট। টাকা গুলো সম্মানি বাবদ দেওয়া হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইয়েন না।
অভিযোগের বিষয়ে আলমগীর ঠাকুর, মামুন চেয়ারম্যান, শহিদুল শহিদ ও আমিন রসুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে এই বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তারা মেসেজ সিন করে কোনো রেসপন্স করেননি।
হোটেল জামানের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে আহ্বায়ক এড.আবু তাহেরকে শহিদ ও আমিন রসুলকে নিয়ে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী শনিবারে সবাইকে নিয়ে আবার বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত হলেও বিএনপি নেতারা এই বিষয়ে একেবারে চুপ হয়ে যায়। কেন এবং কি কারণে এমনটা হয়েছে তা স্পষ্ট করা যায়নি। এই বিষয়ের সাথে আর্থিক ভাবে এড. আবু তাহের ও ইঞ্জি. বেলায়েত হোসেন জড়িয়েছেন কি না তা পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যাবে।
তবে বৈঠক না হলেও জগলুল নয়নকে শহিদ ও আমিন রসুলের বিরুদ্ধে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। জগলুল নয়ন মামলা সিদ্ধান্ত নিলে আলামগীর ঠাকুরের হস্তক্ষেপে নয়ন কোম্পানি মামলা করা থেকে বিরত থাকেন। এরপর থেকে চাঁদাবাজি আর অর্থ আত্মসাৎতের বিষয়টি অন্ধকারে ঢাকা পরে যায়।
শহিদের চাঁদাবাজি এখনো শেষ হয়নি। এই ঘটনার পরও মাস খানেক আগে গুপ্তছড়া টিকেট কাউন্টার থেকে আবারও শহিদ ৫০ হাজার টাকা নেয়। ভবিষ্যতেও এমন কাজ অব্যাহত থাকবে কি না সেটা সময়ে উপর ছেড়ে দিয়ে এবারের মতো অনুসন্ধান শেষ হল।
