সন্দ্বীপের এক ঠাকুরের খতিয়ান: অভিযোগ, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের চিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিশেষ ইনসাইড

8 Min Read
Highlights
  • দখল দারিত্ব, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও শিশু বলাৎকার
  • ঠাকুরের 'গ্রিন সিগন্যাল'
  • ঠাকুরের কাছারি
  • সন্দ্বীপের 'ডন'

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে রাতারাতি আধিপত্য বিস্তার করেছেন উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলমগীর হোসাইন ঠাকুর। তার বিরুদ্ধে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও শিশু বলাৎকারের মতো পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। ব্যবস্থা নিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কাছে জমা পড়েছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর গোপন নথি ও প্রমাণাদি। সেসব নথিও এসেছে আমাদের হাতে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আলমগীর ঠাকুরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কদর্য অভিযোগটি শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন। সম্প্রতি ১৪ বছরের এক কিশোরকে বলাৎকারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হরিশপুর ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এক শিশুকে বলাৎকারের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উপজেলা বিএনপির ১১ জন যুগ্ম আহ্বায়ক তাঁর বহিষ্কার চেয়ে কেন্দ্র ও জেলা কমিটিতে লিখিত অভিযোগ দেন এবং চট্টগ্রামে মানববন্ধন করেন। পদ-পদবির লোভ দেখিয়ে জুনিয়র নেতাকর্মীদের ওপরও তিনি এমন যৌন নির্যাতন চালাতেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, সন্দ্বীপ পৌরসভা এলাকায় নির্মিত আলমগীর ঠাকুরের ‘কাছারি বাড়ি’ এখন দ্বীপের সমান্তরাল প্রশাসন। সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে থানা ও স্থানীয় প্রশাসন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, থানায় কোনো অভিযোগ আমলে নিতে বা আসামি ধরতে ঠাকুরের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ লাগে। এছাড়া সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী আলিমের সাথে অনৈতিক সখ্যতায় কোনো কাজ না করেই ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন এই নেতা। তদন্তে সত্যতা মেলায় সেই প্রকৌশলী আলীমকে বদলি করা হলেও পার পেয়ে যান ঠাকুর।

৫ আগস্টের পর আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিপুল সম্পদ জোরপূর্বক কবজায় নিয়েছেন এই বিএনপি নেতা। এর মধ্যে সাবেক পৌর মেয়র মোক্তাদের মাওলা সেলিমের ১০ কোটি টাকার ১১টি ফিশিং বোট ও ২৬টি মহিষ, এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের ৫টি মালবাহী বোট ও ৯টি স্পিডবোট অন্যতম। প্রশাসনকে চাপ দিয়ে গেজেট বহির্ভূতভাবে স্পিডবোটের ভাড়া বাড়িয়ে পরিবহন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে। পাশাপাশি, পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক বন্ধ ঘোষিত ‘বিবিএস’ ও ‘তাজ ব্রিকস’ নামের দুটি অবৈধ ইটভাটা পুনরায় চালু করে তার জ্বালানি জোগাতে উড়ির চরের উপকূলীয় বন উজাড় করছে তাঁর অনুগত বাহিনী। হরিশপুরের নতুন চরের প্রায় ২০ একর খাস জমি ও যৌথ সম্পত্তি একা দখল করে ১ কোটি টাকার মাটি বিক্রি ও ব্যক্তিগত ফিশিং প্রজেক্ট তৈরির অভিযোগও রয়েছে।

ঠিকাদার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও তাঁর চাঁদাবাজির প্রধান শিকার। কার্গিল হাইস্কুলের ভবন নির্মাণ কাজ থেকে ‘সামিহা এন্টারপ্রাইজ’ নামক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিনি দফায় দফায় ৪ লাখ টাকা চাঁদা নিয়েছেন। যার সর্বশেষ ৭০ হাজার টাকা ৩ ধাপে ২০ হাজার, ২০ হাজার ও ৩০ হাজার করে মোট ৭০ হাজার টাকা মগধরা ৯নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে আলমগীর ঠাকুরের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এছাড়া গুপ্তছড়া স্টিমার সড়ক, নাজির হাট সড়ক এবং ব্লক বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের কমিশন তুলছেন। আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের সন্দ্বীপে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ‘সেফ প্যাসেজ’ দেওয়ার বিনিময়ে জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাণিজ্য ক্ষেত্রেও থাবা বসিয়েছেন ঠাকুর। পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ অন্তত ১৫টি খাল দখল করে মাছের ঘের তৈরি করায় সাম্প্রতিক সন্দ্বীপে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি অন্যতম কারণ।

২০২৪-২৫ অর্থ বছরে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় সন্দ্বীপ উপজেলার জন্য ১৮০ টি গভীর নলকূপ বরাদ্দ করা হয়। বরাদ্দকৃত নলকূপের মধ্যে প্রায় ১০০টি রাজনৈতিক নেতাদের হস্তগত হয়। যার মধ্যে আলমগীর ঠাকুর ভাগিয়ে নেন ১০ টি নলকূপ।

পাশাপাশি জড়িয়েছেন বৈদ্যুতিক পোল বানিজ্যে। ডিসেম্বর ২০২৪ এ নতুন পোলের জন্য আলমগীর ঠাকুর ৭টিরও বেশি গ্রাহকের জন্য সুপারিশ করেছেন। এরমধ্যে, সিরিয়াল লং ১০২৪, ১০২৫ ও ১০৩১ অন্যতম। যেখানে অবশ্যই তার ক্ষমতা জানান দিতে ওনি সাইন সহ দলীয় সিল ব্যবহার করেছেন। অথচ, একজন রাজনৈতিক দলের নেতা কোনো ভাবে এমন সুপারিশ করার ইশতেহার রাখেন না।

তার বিরুদ্ধে সামাজিক বিচার মিমাংসার নামে সাধারণ অভিযোগকারীদের আমানতের টাকা আত্মসাৎতের বেশ কয়েকটি অভিযোগ উঠেছে। তারমধ্যে ২ই এপ্রিল ২০২৫ সন্দ্বীপের মগধরা ইউনিয়নের পেলিশ্যার বাজারে স্থানীয় যুবক ও দোকান ব্যবসায়ীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায়, মোঃ মাইনউদ্দীন নামে এক পক্ষ থেকে ১ লক্ষ টাকা আমানত নিয়ে বিচার না করে দীর্ঘদিন আমানতের টাকা আত্মসাৎ করে রাখেন। পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়াতে বিষয়টি আলোচনায় আসলে তিনি চাপে মুখে আমানতের ১ লক্ষ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন।

সম্প্রতি পন্ডিতের হাট ইজারা দেওয়ার কথা বলে ৪ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা অগ্রিম হাতিয়ে নিয়েছেন। এভাবে সন্দ্বীপের প্রতিটি হাট বাজার ইজারা নিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। তার মধ্যে এরশাদ মার্কেট ইজারা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে যুবদল কর্মী মাহফুজ রিমন থেকে আড়াই লক্ষ টাকা নিয়েছেন। স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে দেওয়া টাকা ফেরত চাইলে আলমগীর ঠাকুর রিমনকে মাদক ব্যবসায় জড়ানোর প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ৬ জুন ২০২৬ অস্ত্র উদ্ধারের মিথ্যা নাটক সাজিয়ে তাকে অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয়। যা ১ জুলাই ২০২৬ চট্টগ্রাম কোর্ট লকআপ থেকে ফেসবুক পোস্টে রিমন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

৫ই আগষ্টের পর গুপ্তছড়া ঘাটের অর্ধকোটি টাকা  চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাৎতের ঘটনায় পিছন থেকে নাম জড়িয়েছেন এই বিএনপি নেতা। তার ঘনিষ্ঠ অনুসারী উপজলা ছাত্রদল সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম শহিদ ও মগধরা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি আমিন রসুলের মাধ্যমে ওই অর্থ তার কাচারিতে ভাগাভাগি হয়েছে বলে সাম্প্রতিক সময়ে ৪ পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

রাতের আধাঁরে গুপ্তছড়া ঘাটে সিমেন্টের ট্রলার বা মালের বোট ডাকাতির পিছনে মাস্টার মাইন্ড এই আলমগীর ঠাকুর। শহিদ ও আমিন রসুলকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কায়দায় বোট আক্রমণ করে ৬ ড্রাম তেল লুট করেন। যার প্রত্যেকটি তেলের ড্রামের মূল্য সাড়ে ২২ হাজার টাকা। শুধু ড্রাম লুট নয়, বোটটি আটক করেও ৫ লক্ষ টাকা নগদ চাঁদা আদায় করেন। যা বোটের মাঝি পরদিন সকালে ইসলামী ব্যাংকের কমপ্লেক্স শাখা থেকে উত্তোলন করে দুপুর ১১টার সময় ঘাটের পাশে কেরবা বা কেওড়া বাগানে শহিদ ও আমিন রসুলের হাতে তুলে দেন। একই কায়দায় সাম্প্রতিক সময়ে গাছুয়া হক সাহেবের বাজার ঘাটে সিমেন্টের ট্রলার লুটের সাথেও আলমগীর ঠাকুর নাম জড়িয়েছেন। ২০০ বস্তা সিমেন্ট লুটের একটি নিদিষ্ট অংশের ভাগ তিনি পেয়েছেন।

আলমগীর ঠাকুর তার সহযোগী জলদস্যু আফছারের মাধ্যমে অবৈধ খসকি জাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে দৈনিক সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় করছেন। এ বিষয়ে উড়ির চর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা জাবেদের সাথে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা লেনদেনের একটি অডিও রেকর্ডও এসেছে আমাদের হাতে। এছাড়া সাধারণ জেলেদের ধরা মাছের এক-তৃতীয়াংশ বাধ্যতামূলকভাবে পাঠাতে হয় তার কাছারি বাড়িতে। পৌরসভা ও মুছাপুরের চিহ্নিত ৬টি স্পটে ইয়াবা সিন্ডিকেট এবং গুপ্তছড়া ঘাট এলাকায় প্রায় ৫০টি জুয়ার আসর তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে, যার দৈনিক লভ্যাংশ সরাসরি চলে যায় তার কাছারি বাড়ির ডেরায়।

স্থানীয়দের মতে, বর্তমান সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশার বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তার প্রতিনিধি হিসেবে সরকারি দপ্তরগুলো এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন আলমগীর ঠাকুর।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি মোস্তফা কামাল পাশা বলেন,

আলমগীর ঠাকুরের কোনো অপকর্মের দায়ভার আমি নিবো না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আলমগীর হোসাইন ঠাকুর গভীর নলকূপ ও বৈদ্যুতিক খুঁটির জন্য সুপারিশ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। মেসার্স সামিহা এন্টারপ্রাইজ থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি তার স্মরণে নেই। বিভিন্ন নির্মাণকাজের ক্রয়কৃত ঠিকাদারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন। তবে ইটভাটার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

সুস্পষ্ট প্রমাণ, অডিও রেকর্ড ও ভিডিও থাকার পরও সন্দ্বীপের এই ‘ডন’ কার খুঁটির জোরে পার পেয়ে যাচ্ছেন- তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্দ্বীপবাসী এখন সুশাসনের আশায় বিএনপির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপের অপেক্ষায়।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *