প্রথম পর্বের পর থেকে…
স্পিডবোটের পাশাপাশি ঘাটে চলাচলকারী ২৪টি ভ্যান থেকেও প্রতিদিন ভ্যানপ্রতি ২০০ টাকা করে মোট ৪ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করা হতো বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চালক আবুল কালাম দিন শেষে আদায়কৃত অর্থ শহিদের আত্মীয় আলাউদ্দিন সওদাগরের চায়ের দোকানে জমা দিতেন। এভাবে প্রায় ৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা জমা হয়। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা বিএনপির উপজেলা পার্টি অফিসের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে ব্যয় করা হলেও বাকি টাকা চলে যায় শহিদ ও তার নেতাদের পকেটে।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবু তাহের গুপ্তচরা ঘাটে ব্রীজের উপর বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। একই বিষয়ে অনুসন্ধান টিম বিএনপি নেতা ইঞ্জি. বেলায়েত হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনিও এই বিষয়ে অবগত বলে স্পষ্ট করেছেন। তবে হোটেল জামানের বৈঠকে শহিদপক্ষের দাবি, এই অর্থ থেকে ১ লক্ষ টাকা ঘাটে নৌবাহিনীর হাতে আহত নেতাকর্মীদের (যারা ঘাটের দায়িত্বে ছিলো) চিকিৎসায় ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে, যার মধ্যে হোটেল জামানের বৈঠকের আগ পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকা খরচ করা হয়। তবে জগলুল হোসাইন নয়নের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আহত কর্মীদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় ঘাট ইজারাদার কতৃপক্ষ বহন করেছেন।
বৈঠকে শহিদ আরো স্পষ্ট করেন, ঐ টাকা থেকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা ঘাটের আশেপাশের নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীকে দিয়েছেন। তবে, এর বাহিরে অবশিষ্ট টাকার সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি শহিদপক্ষ। এই বিষয়ে বৈঠকে আহ্বায়ক এড. আবু তাহের দাবি করেন, ভ্যান গাড়ি থেকে আয় করা টাকার তেমন কোনো খরচের খাত ছিলো না। কিন্তু, বৈঠকের আগে এড. আবু তাহেরের প্রশ্নের মুখে শহিদ এই খাত থেকে জন প্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা করে ৭ জনের সম্মানি দিয়েছেন বলে দাবি করেন। শহিদের দাবি মিথ্যা তখনি প্রমাণিত হয়েছে যখন বৈঠকে এড. আবু তাহেরকে ৭ জনের সম্মানি নিজেদের ব্যয় খাত থেকে দিয়েছেন বলে জগলুল নয়ন স্পষ্ট করেন। কারণ, ভ্যান গাড়ির সাথে ঘাট ইজারাদারের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। এই টাকা পূর্বে আনোয়ার চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে ছিলো, পরে হাত বদল হয়ে যায় শহিদের কাছে।
এর বাহিরে বৈঠকে এড. আবু তাহের তার জানা মতে (বিভিন্ন জনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে) কাঠের বোট, বলগেট, ও গোদী ভাড়া সহ অন্যান্য হিসাব বাবদ আরো প্রায় ১৫ লক্ষের বেশি টাকার হিসাব দাবি করেন। বৈঠকে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য অনুসারে, ঘাটে প্রতিদিন প্রায় ৫-১০ টা বলগেট ঢুকতো। ঐ সময়ে প্রায় ১০০ বলগেট ঢুকার দাবি করা হয়। প্রতি বলগেটের গোদী ভাড়া নেওয়া হতো ৩ হাজার ৫০০ টাকা। বৈঠকে আবদুল ওহাব কবির নামে এক যুগ্ম-আহ্বায়ক দাবি করেন তাদের ৩ টি বলগেট থেকে সাড়ে ১০ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এই হিসেবে ১০০ বলগেট থেকে প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা আদায় হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট জোর দেন আবদুল ওহাব কবির।
সাধারণত নৌকার মালিকরা ঘাট, নদী বা খালের তীরে বা পানিতে নির্দিষ্ট স্থানে নৌকা বেঁধে রাখা বা নোঙর করার জন্য জমির মালিক, ঘাট ইজারাদার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যে ভাড়া বা ফি প্রদান করেন, সেটা হচ্ছে গোদী ভাড়া। যতবার বলগেট বা বোট খালের ভিতর ঢুকবে ততবার এই ভাড়া দিতে হয়। দরুন, কোনো বলগেট ঘাট থেকে ছেড়ে গিয়ে খালের মুখ পর্যন্ত গিয়েছে, বৈয়রী আবহাওয়াতে খালের মুখ থেলে আবার ফেরত এসেছে, তখনও ঐ বলগেটের জন্য পুনরায় গোদী ভাড়া দিতে হবে।
ঘাট উন্মুক্ত হওয়া বা ইজারা প্রথা বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত ইজাদার কতৃপক্ষ এই টাকা আদায় করতো। সে হিসেবে জগলুল নয়ন শহিদকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে শহিদ নেতাদের বলগেট বলে চালিয়ে দিতেন। সে যুক্তি দিতো এই বলগেট গুলো মধ্যে আনিস আক্তারের ২৫ টি ও মসি সহ অন্যান্যদের বেশ কয়েকটি ছিলো, যারা বিএনপির নেতা হওয়ার কারণে কেউ গোদী ভাড়া দিতো না। তবে জগলুল নয়নের চাপে মুখে সে একবার এই ভাড়া বাবদ ১০ হাজার টাকা জগলুল নয়নকে প্রদান করেন। পরবর্তীকে এই ভাড়া সংগ্রহের জন্য শহিদ হেলাল নামে এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেন। সর্বশেষ তথ্য মতে শহিদ ও হেলাল কেউ আর জগলুল নয়নকে গোদী ভাড়া দেননি।
বৈঠকে কাঠের বোট ভাড়ার বিষয়েও স্পষ্ট আরগিউম্যান্ট করা হয়। বৈঠকে আলোচকেরা দাবি করেন, আবু তাহের কন্টাক্টর নামে এক ব্যক্তিকে তার ১৮টি কাঠের বোটের জন্য ৬০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে। এই উদাহরণ টানলে বাকি বোট গুলোর কোনো সুস্পষ্ট হিসাব নেই এবং এই হিসাব খাত থেকে শহিদ ও তার অনুসারীরা কত লক্ষ টাকা লুট ও আত্মসাৎ করেছে তা কল্পনারও বাহিরে।
শহিদ কাণ্ডের এখনো ইতি টানার সময় হয়নি। এরপর জুয়া আসর কাণ্ড। এই কাণ্ড সম্পর্কে অল্প কিছু বাক্য ব্যয় করে আজকের পর্ব শেষ করবো। মাস খানেক আগে গুপ্তছড়া ঘাটে কেওড়া বা কেরবা বাগানের ভিতরে শহীদের নেতৃত্বে একটি জুয়ার আসর বসানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথম দিনেই প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়, যার মধ্যে ২০ হাজার টাকা শহীদ নিয়ে নেন বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন মনির। তবে রাজনৈতিক চাপে ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে জুয়ার আসর বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
(তৃতীয় পর্বে থাকছে চট্টগ্রাম অলঙ্কার মোড়ে হোটেল জামানে বিএনপি নেতাদের বৈঠকের বিস্তারিত, তাদের বক্তব্যে কে কি বলেছেন এবং বিভিন্ন থিউরি দিয়ে এই সমস্ত বিষয়ের বিশ্লেষণ। সর্বশেষ পর্বে থাকবে মামুন চেয়ারম্যান ও আলমগীর ঠাকুর এই সমস্ত কর্মকাণ্ডে কিভাবে সংপৃক্ত তার যুক্তি সহ বিস্তারিত)
অপেক্ষা…
