২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগে গুপ্তছড়া ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে শুরু হয় নতুন সমীকরণ। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, আর্থিক হিসাব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং একাধিক বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণে ঘাট পরিচালনাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪৬ লাখ ৫১ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপজেলা ছাত্রদল সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম শহিদ, তার গুরু ঠাকুর ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুরো দেশ যেখানে চরম সংকটে ঠিক সে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া ঘাট দখল করে উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নাম ভাঙিয়ে একটি মহল। মূলত পটপরিবর্তনের পর উপজেলা বিএনপি পক্ষ থেকে ইঞ্জি. বেলায়েত হোসেনের (বর্তমান সিডিএ চেয়ারম্যান) নিয়ন্ত্রণে ঘাট পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেও, ৬ই আগষ্ট সকাল থেকে শহিদের নেতৃত্বে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের প্রায় ৫০-৬০ জন কর্মী গুপ্তছড়া ঘাটে অবস্থান নেন। তৎকালীন ঘাট ইজারা ব্যবসার অন্যতম অংশীদার আওয়ামীলীগ নেতা আনোয়ার চেয়ারম্যানের শালা মোঃ সোহরাব হোসেনকে দায়িত্বে রেখে হরিলুটের খেলায় মেতে উঠে উপজেলা ছাত্রদল সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম শহিদ ও তার অনুসারীরা। ৬ আগষ্ট থেকে পরবর্তী ৪৩ দিনে শহিদের নেতৃত্বে সোহরাবের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা করে ৫০-৬০ জন নেতাকর্মীর নাম দেখিয়ে তথাকথিত ‘সম্মানি’ (চাঁদার উন্নত সংস্করণ) বিতরণ করা হয়। জনপ্রতি নেতাকর্মীর অবস্থান বিবেচনায় ৫০০, ৬০০ ও ১০০০ টাকা প্রদান করা হয়। পুরো সময়ে এই খাতে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এই সকল নেতাকর্মীদের প্রায় সবাই ছিল মগধরা ও ঘাটের আশে পাশে শহিদ ও উপজেলা বিএনপি সদস্য সচিব আলমগীর ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ জন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সোহরাবের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় মতবিরোধ ও সুবিধা করতে না পেরে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন শহিদ ও তার অনুসারীরা। ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত কাউন্টার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন শহিদের ঘনিষ্ঠ আমিন রসুল। এই সময় শহিদ ও তার অনুসারীরা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সম্মানি দেওয়ার নামে আত্মসাৎ করে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, সেপ্টেম্বরের শেষ ১৫ দিন ৩ লক্ষ ৬৩ হাজার, অক্টোবরে ৪ লক্ষ ৫৬ হাজার এবং নভেম্বরে ৪ লক্ষ ২৭ হাজার টাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ এমাউন্ট, যা হোটেল জামানের বৈঠকে (বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত পরবর্তী পর্বে থাকছে) শহিদ ও জগলুল নয়নের (আরেক অংশীদার) উভয় পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়।
এই সম্মানির বাহিরে ‘কাউন্টার খরচ’ নামে একটি জটিল হিসাবের সন্ধান পেয়েছে অনুসন্ধান টিম। জগলুল নয়নের বৈঠকে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘কাউন্টার খরচ’ দেখানো হতো যা সম্মানি, স্টাফ বেতন, চা-নাস্তার ও আনুষাঙ্গিক খরচের বাহিরে। এই কাউন্টার খরচের উল্লেখযোগ্য ব্যয় খাত ছিল, পার্টির বিভিন্ন উৎসবে কেক কাটা, পার্টির অনুষ্ঠান, পার্টির মিছিল মিটিং এবং নেতাকর্মীদের দুপুরের খাবার সহ আপ্যায়ন বিল। উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকে নিদিষ্ট অংকের সম্মানি (চাঁদা) এই খাত থেকে দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে দাবি করে শহিদপক্ষ।
চাঁদা সম্মানির পাশাপাশি আরেক প্রকার সম্মানির বিষয়ও আবিষ্কার করেছে অনুসন্ধান টিম। সেটা হচ্ছে চাকরির ‘বেতন সম্মানি’। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর শহিদের উদ্যোগে এবং জগলুল নয়নের সম্মতিতে সাতজনকে মাসিক ১৫ হাজার টাকা করে সম্মানিভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা হলেন—শহিদ, গোপরান, আলাউদ্দিন, ওসমান, আবদুল হামিদ, এরশাদ ও লিটন। এদের প্রত্যেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সাথে যুক্ত।
সূত্র জানায়, শুরুতে প্রত্যেকে ৩০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে মাসিক ১৫ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। প্রতি মাসে এই খাতে ব্যয় দেখানো হয় ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। তাদের দায়িত্ব ছিল ঘাটে কোনো বাধা সৃষ্টি না হতে দেওয়া এবং সার্বিক তদারকি করা।
পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ঘাটে প্রতিদিন সম্মানি পাওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। সংখ্যা কমার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল উপস্থিত নেতাকর্মীর চেয়ে সংখ্যায় কম হওয়া, যা সম্মানির টাকা আত্মসাৎ করার জন্য অতিরিক্ত দেখানো হতো। বিশেষ করে জগলুল নয়নদের তদারকি ও আপত্তির মুখে এই সংখ্যা পর্যায়ক্রমে হ্রাস পায়। পরে ঘাটের নিরাপত্তা ও তদারকির দায়িত্বে সাতজনকে মাসিক সম্মানিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে ইজারাদার পক্ষ প্রশ্ন তোলে—যখন নির্দিষ্ট দায়িত্বে সাতজনকে নিয়মিত সম্মানি দেওয়া হচ্ছে, তখন অতিরিক্ত ব্যক্তিদের কেন প্রতিদিন আলাদাভাবে সম্মানি দেওয়া হবে?
এই সিদ্ধান্তের পরদিনই দৈনিক ভিত্তিতে সম্মানি পাওয়া প্রায় ২০ জনকে এককালীন মোট ৯৫ হাজার টাকা পরিশোধ করে তাৎক্ষণিক তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এবার সব ঠিক হয়ে যাবে মনে করলে ভুল হবে। সমস্যা তৈরি হয় শহিদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী আমিন রসুলকে (মগধরা ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি) নিয়ে। কাউন্টার খরচ আর আমিন রসুল যেনো একই সূত্রে গাঁথা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কতৃপক্ষের হিসাবের বাহিরেও শহিদ আমিন রসুলের মাধ্যমে কাউন্টার থেকে টাকা সরিয়েছে। কোনো কোনো সময় কতৃপক্ষ অবগত থাকলেও বেশি ভাগ সময় গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টাকা চলে যেতো উপরে। এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘাটের এক কর্মচারী বলেন,
মূলত আমিন রসুল ছিল শহিদের বিশ্বস্ত এজেন্ট। টিকিট বিক্রিতে অনেক ভাবে টাকা সরানোর সুযোগ থাকে। যতটুকু আমরা ধরতে পারতাম তার হিসাব রাখা হতো। বাস্তবিক অর্থে শহিদ আমিন রসুলের মাধ্যমে গোপনে অনেক টাকা সরিয়েছে, যার কোনো হিসাব নেই।
প্রতিদিন অস্বাভাবিক ‘কাউন্টার খরচ’ সম্পর্কে আমিন রসুলের কাছে কতৃপক্ষ জগলুল নয়ন জানতে চাইলে সে উত্তরে বলতো,
ঘাট চালাতে হলে এরকম খরচ দিতে হবে। কিছু করার নেই।
আমিন রসুলের কর্মকাণ্ডে অসহায় ও বিরক্ত হয়ে জগলুল নয়ন একাধিকবার তাকে কাউন্টার থেকে সরানোর জন্য শহিদকে অনুরোধ করেন। প্রত্যেকবার শহিদ পাশ কাটিয়ে গেলেও পরে ১ ডিসেম্বরের ঘাট পরিচালনা সংক্রান্ত মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ডিসেম্বরের শেষের দিকে ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাবেক ছাত্রদল নেতা আনিস আক্তার টিটু সহ অন্যরা।
তাহলে এবার কি শহিদ কাণ্ডে সমাপ্তি হবে?
অনুসন্ধান গভীরে চলছে। তথ্য বলছে শহিদ কাণ্ড আগামী পর্বেও বিস্তৃত হয়েছে। তার মধ্যে মালের বোট ডাকাতি, ভ্যান গাড়ি, ‘বলগেট’ বা ‘বাল্কহেড’ ও গোদী ভাড়া, জুয়ার আসর সহ ইত্যাদি কাণ্ড উল্লেখযোগ্য। উপরে টাকা কোথায় গেছে, বৈঠকে কি সিদ্ধান্ত হলো, স্পীডবোট ৩০০ টাকা করার সাথে ঠাকুর কিভাবে সম্পর্কিত তার বিস্তারিত থাকছে।
অপেক্ষা…
