ঠাকুরের ইশারায় বিএনপির নামে গুপ্তছড়া ঘাটের চাঁদাবাজির অর্ধ কোটি টাকা ভাগাভাগি (৩য় পর্ব)

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিশেষ ইনসাইড

6 Min Read
Highlights
  • উপজেলা বিএনপির টোটালি মা-বাপ তারা
  • কি দিয়া সুবিধা নিলা? দলটা বিক্রি কইরা?
  • একটা সাগর চুরি করে ফেলছে চার মাসে

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে…

চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আদায়কৃত অর্থ প্রথমদিকে শহিদ, আমিন রসুল এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই টাকার গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ জানাজানি হলে সন্দ্বীপ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নীরব ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েন। অভিযোগের টাকার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও, কয়েকজন নির্দিষ্ট নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো দলের বদনাম হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে দলীয় অনেকেই সরব হতে শুরু করেন।

বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় প্রকাশ্যে একাধিক বৈঠক ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উপজেলা বিএনপির পার্টি অফিসে অনুষ্ঠিত একটি রুদ্ধশ্বাস বৈঠক। ওই বৈঠকে উপজেলা বিএনপির কমিটির সকল সদস্য, প্রতিটি ইউনিয়ন বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে কয়েকজন যুগ্ম আহ্বায়ক অভিযোগগুলোর বিষয়ে কড়া অবস্থান নেন। আলোচনার একপর্যায়ে ঘাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জগলুল হোসাইন নয়নকে উপস্থিত সবার সামনে ফোন করা হলে তিনি নিজের অবস্থান ও অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন বলে বৈঠকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

এরপর উপজেলা বিএনপির নেতাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আরও তৎপরতা দেখা দেয়। জগলুল নয়নের পক্ষ থেকেও উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দকে পুনরায় অভিযোগ ও বিভিন্ন তথ্য জানানো হলে চট্টগ্রামের অলংকার মোড়ের হোটেল জামানে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটব্যাপী একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় শুক্রবার, জুমার নামাজের ঠিক আগ মুহূর্তে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক দুই যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাউদ্দিন ও ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন (বর্তমান সিডিএ চেয়ারম্যান), উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এড. আবু তাহের, সদস্য সচিব আলমগীর ঠাকুর এবং যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাসেম মাস্টার (চট্টগ্রাম-৩ আসনের এমপির ব্যক্তিগত সহকারী), আবদুল ওহাব কবির, গাজী হানিফ, জাহাঙ্গীর হোসেন ও কাউছার আহমেদ। এছাড়া ঘাট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি জগলুল নয়ন ও তার ম্যানেজার, সোহরাব হোসেন, শহিদুল শহিদ, আমিন রসুলসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও আলোচকেরা বিএনপির নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বৈঠকের পুরো সময়ের একটি গোপন ভিডিও ইনসাইড টিভি অনুসন্ধান টিমের হাতে এসেছে। ওই ভিডিওতে জগলুল নয়নের ম্যানেজার, সোহরাব এবং শহিদ নিজ নিজ পক্ষ থেকে বিভিন্ন হিসাব তুলে ধরেন, যা গত দুই পর্বে অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকাশ করা হয়েছে। বৈঠকের শেষ দিকে অ্যাডভোকেট আবু তাহের পুরো হিসাবের একটি খসড়া প্রস্তুত করেন।

বৈঠকে উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বের সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। উপস্থিত অনেকেই এড. আবু তাহের ও আলমগীর ঠাকুরের নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। আলোচনায় উঠে আসে, স্বল্প সময়ের জন্য গঠিত আহ্বায়ক কমিটি বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করলেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রত্যাশিত সফলতা দেখাতে পারেনি। কমিটির বিভিন্ন ব্যর্থতার বিষয়েও বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী হানিফ বলেন,

সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির যে আহ্বায়ক কমিটি আছে, ওইটা কোনো বিএনপি নয়। উপজেলা বিএনপির টোটালি মা-বাপ তারা।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত বিষয়ে পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। তবে উপস্থিত আলোচক বা বক্তাদের বেশ কয়েকটি উক্তি নিম্নে তুলে ধরা হলো..

বিশ্বাস করেন সালাউদ্দিন ভাই। গোপনে এই বিষয়ে (ঘাটে চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাৎ) আমি অনেক তদন্ত করেছি। এই বিষয়ে আমার জানা আছে। – আবুল কাসেম মাষ্টার

একজন মানুষ সব দিকে বেনিফিশারি হতে পারে না। তোমরা বলগেট, ভ্যান গাড়ি, গোদী ভাড়া কোন খাত থেকে কত টাকা নিয়েছো, কত টাকা খরচ হয়েছে তার একটা হিসাব দাও। না হয় আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবো। দল যেখানে বিতর্কিত হবে, আমার মনে হয় এই বিষয় গুলো দপ্তরে কেউ পাঠালে আমাদের বহিষ্কার করে দিবে। সর্ব প্রথম আমি, তাহের সাহেব ও আলমগীর ঠাকুর বহিষ্কার হবোই হবোই। তোমরা অনিয়ম করছো। এখন তো দেখতেছি ঘটনা সত্য। সাংবাদিকেরা আমাদের যে প্রশ্ন করে আসলে তারা ঠিক। -ইঞ্জি. বেলায়েত হোসেন

সুবিধা ঠিকাছে। স্বাভাবিক ভাবে তোমরা যারা জড়িত ছিলা তারা সুবিধা নিয়ছো। কি দিয়া সুবিধা নিয়েছো? দলটা বিক্রি কইরা?- কাজী সালাউদ্দিন

একটা সাগর চুরি করে ফেলছে চার মাসে। আওয়ামীলীগের আমলে যা হয় নাই, তার চেয়ে বেশি লুটপাট করেছে বিএনপির নামধারী কিছু লোকজন। আরো ১০০ গুণ বেশি করছে।- জাহাঙ্গীর হোসেন

অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী এই বিষয় গুলো অর্থনীতির দুটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা—Cost-Push Theory এবং Cost Pass-Through—এ ধরনের ঘটনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যাখ্যা করতে সহায়ক।

Cost-Push Theory অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেই অতিরিক্ত ব্যয় কোনো না কোনোভাবে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়। ঘাট পরিচালনার ক্ষেত্রে জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের পাশাপাশি যদি অভিযোগ অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও পরিচালন ব্যয়ের অংশে পরিণত হয়। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লোকসান এড়াতে ভাড়া বৃদ্ধি, ব্যয় সংকোচন অথবা সেবার মান কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

অন্যদিকে Cost Pass-Through ধারণা বলছে, কোনো ব্যবসার অতিরিক্ত ব্যয় সব সময় মালিক নিজে বহন করেন না। বাজারের অবস্থা, প্রতিযোগিতা, যাত্রী চাহিদা এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সেই ব্যয়ের একটি অংশ বা পুরোটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর স্থানান্তরিত হতে পারে। অর্থাৎ, অভিযোগ অনুযায়ী যদি ইজারাদার বা নৌ-যান মালিকদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়ে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব যাত্রীভাড়া, পরিবহন ব্যয় কিংবা সেবার মানের ওপর পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ ব্যয়কে অনেক সময় “Informal Cost” বা “Informal Tax” হিসেবেও বিশ্লেষণ করা হয়। কারণ, এটি ব্যবসার উৎপাদন বা সেবা প্রদানের প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রী, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ভবিষ্যতে নৌ-যাতায়াত ভাড়া কমার সম্ভাবনা তো ক্ষীণ, বরং সময়ে সেটা উচ্চ মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে পারে।

(শেষ পর্বে মালের বোট ডাকাতি, আলমগীর ঠাকুর ও মামুন চেয়ারম্যান কিভাবে এই বিষয়ের সাথে জড়িত তার বিস্তারিত থাকছে)

অপেক্ষা…

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *