ভারতে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরগুলোতে স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং বিদেশগামী ও আগত যাত্রীদের জন্য জারি করা হয়েছে বিশেষ স্বাস্থ্য নির্দেশনা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভারতসহ যেসব দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী, সেইসব দেশে প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বয়স্ক, অসুস্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রায় দেড় বছর পর দেশে আবারও কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৮০ বছর পার করা এক বৃদ্ধ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ওই ব্যক্তির একাধিক জটিল রোগ ছিল, যা সংক্রমণকে মারাত্মক করে তোলে।
মৃত্যুর এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি করলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতিমাত্রায় আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে পাওয়া সাম্প্রতিক নমুনাগুলোর বেশিরভাগেই ‘XF-G’ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে, যা ওমিক্রনের JN.1 উপ-ধারার একটি শক্তিশালী সাব-ভ্যারিয়েন্ট। থাইল্যান্ড ও চীনের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ভারতেও এই ভ্যারিয়েন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালা, গুজরাট ও পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে কোভিড সংক্রমণের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব অঞ্চলে দ্রুত ছড়াতে থাকা NB.1.8.1 নামের আরেকটি নতুন ভ্যারিয়েন্টও বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যেই বেনাপোলসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরগুলোতে যাত্রীদের জিনোম সিকোয়েন্সিংসহ স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। ইমিগ্রেশন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে স্বাস্থ্য ডেস্ক, যেখান থেকে সন্দেহভাজন যাত্রীদের আলাদা করে আইসোলেশন সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪ জুনের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভারতফেরত যাত্রীদের নিবিড়ভাবে স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্য বার্তা সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে যেন দ্রুত আইসোলেশন নিশ্চিত করা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বর্তমানে বেশিরভাগ কোভিড টিকা নিচ্ছেন শুধুমাত্র বিদেশগামী যাত্রীরা। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—যেমন বয়স্ক, কিডনি রোগী, ক্যানসার রোগী বা গর্ভবতী নারীদের মধ্যে টিকা গ্রহণের হার অত্যন্ত কম।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, “এই ভাইরাসের যে কোনো নতুন ভ্যারিয়েন্টই দুর্বল স্বাস্থ্যসম্পন্ন মানুষের জন্য মারাত্মক হতে পারে। আমাদের আবারও স্বাস্থ্যবিধি—মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়া ও জনসমাগম এড়িয়ে চলার চর্চায় ফিরতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, “হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যারা যাচ্ছেন, কিংবা সেখানে যারা কাজ করছেন—সবাইকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মাস্ক ও জীবাণুনাশক ব্যবহারে শিথিলতা করা যাবে না।”
জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির তথ্যমতে, সরকারের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে কোভিড টিকা মজুত রয়েছে। তবে জনসচেতনতায় ঘাটতির কারণে টিকাগ্রহণে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। গত ২২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক ইপিআই বৈঠকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকা দিতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছরের মে মাসে দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ জনে, যেখানে এপ্রিল মাসে ছিল মাত্র ২৩ জন। জুনের প্রথম আট দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬ জন এবং একজন মারা গেছেন।
২০২৫ সালের ৮ জুন পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৫১ হাজার ৭৪২ জন। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২৯ হাজার ৫০০ জন। যদিও ২০২৪ সালে কোভিডে কেউ মারা যায়নি, তবে ২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছিল ৩৭ জনের এবং ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ১,৩৬৮ জন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় মনে করছে, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও যে কোনো সময় সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাই এখনই সচেতন না হলে সামনে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ফরহাদ হোসেন বলেন, “গরম আবহাওয়ায় করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রবণতা আগে থেকেই দেখা গেছে। আমাদের এখনই সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে পরিস্থিতি আবার অতীতের মতো ভয়াবহ রূপ না নেয়।”
