জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা নিয়ে এখন রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দিকে। গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে মৌলিক ঐকমত্য থাকলেও এর আইনি ভিত্তি, গণভোটের সময়সূচি এবং ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য কাটেনি। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই কমিশন সনদ বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ সরকারকে দিতে চায়।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে কমিশন একটি বাস্তবসম্মত সুপারিশ তৈরি করছে। তবে তারা মনে করছে, সুপারিশ যেভাবেই দেওয়া হোক না কেন, তাতে কোনো না কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হবে। শেষ পর্যন্ত সনদ বাস্তবায়নে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য বলে মনে করছে কমিশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গত শুক্রবার (১৭ই অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ২৪টি রাজনৈতিক দল ও জোট সনদে সই করে। তবে সনদের আইনি ভিত্তি নির্ধারিত না হওয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বামধারার আরও চারটি দল এখনো সই করেনি।
কমিশন বর্তমানে একটি বিশেষ আদেশের খসড়া প্রণয়নের কাজ করছে, যার নাম হতে পারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান) আদেশ’। এ আদেশটি সংবিধানের পরিপূরক হিসেবে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদন পাবে। বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যদের মধ্যে আছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা।
কমিশনের মেয়াদ রয়েছে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। তারা আশা করছে, ২৪ অক্টোবরের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দিতে পারলে সরকার অন্তত এক সপ্তাহের মধ্যে সনদ বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করতে পারবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন,
কমিশন এখন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করছে। তাদের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ না দেখা পর্যন্ত মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। আমরা অপেক্ষা করছি কমিশনের প্রস্তাবের ওপর।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা সাতটি দল ইতোমধ্যেই পাঁচ দফা দাবি নিয়ে কর্মসূচি শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (PR) পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচন, গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন এবং নভেম্বরের মধ্যেই ভোট আয়োজনের দাবি। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন,
আমরা চাই আগে গণভোট হোক। আগেও অল্প সময়ের মধ্যে গণভোট আয়োজনের নজির আছে। তাহলে এখন কেন বিলম্ব?
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব জানিয়েছেন,
আমরা আলোচনায় থাকব, কিন্তু সনদে সই করব কি না, তা নির্ভর করবে কমিশনের সুপারিশের ওপর। পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।
এদিকে সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ এখনো সনদে স্বাক্ষর করেনি। চার দল কমিশনের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে জানিয়েছে, সংবিধানের চার মূলনীতি ও কিছু ক্রান্তিকালীন বিধান নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে, এবং এসব বিষয়ে ভিন্নমত থাকা অবস্থায় তারা সনদে সই করতে পারছে না।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন,
আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতেই সুপারিশ তৈরি করছি। মূল লক্ষ্য হলো, সরকার যেন কার্যকর ও স্পষ্টভাবে বাস্তবায়নের পথে এগোতে পারে।
সূত্র বলছে, কমিশন গণভোটে দুটি প্রশ্ন রাখার কথা বিবেচনা করছে—একটি হবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চান কি না, আরেকটি হতে পারে ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলো কার্যকর করা হবে কি না। পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, সংবিধান সংস্কার ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কেও গণভোটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নটি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার মূল আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখন দলগুলোর নজর ঐকমত্য কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশের দিকেই।
