মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আজ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
ভাষণে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সহিংসতা, সংস্কার ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ভয়, সন্ত্রাস কিংবা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না।
ভাষণের শুরুতে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখ যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ হামলাকে তিনি শুধু একজন ব্যক্তির ওপর নয়, বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন। হাদির চিকিৎসা ও নিরাপত্তায় সরকার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীর প্রতি সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং গুজব ও অপপ্রচারে কান না দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলছে, যার মূল লক্ষ্য তরুণ সমাজ। তরুণদের রক্ষা করতে পারলেই রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র নিরাপদ থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভাষণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়েও কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, তার চিকিৎসা সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং অবদান বিবেচনায় তাকে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী দেশে ও বিদেশে চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে— জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। হত্যাকাণ্ডের বিচার আইনি প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
ভাষণে জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারের ভিত্তি। আগামী সংসদ নির্বাচনের দিনই এই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমেই নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারিত হবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন হবে উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ। ভোট ডাকাতি ও বাধা সৃষ্টিকে নাগরিকদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে আখ্যা দেন তিনি। ভোটকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।
প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও পুলিশ সংস্কারের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়াকে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ভাষণের শেষাংশে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনের দায়িত্ব সবার। ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী ও লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা।
