বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত রুস্তম হত্যাকাণ্ডে সাবেক সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলমকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় দেশের প্রশাসনিক মহলেও তীব্র আলোচনার ঝড় উঠেছে। সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জেনিফার জেরিনের আদালতে কারাগার থেকে হাজির করা হয় জিয়াউল আলমকে। তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক কামরুল ইসলাম আদালতে তার গ্রেফতার দেখানোর আবেদন জানান। আদালত তা মঞ্জুর করে তাকে ফের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গত বছরের জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যমূলক নীতি বাতিলের দাবিতে ঢাকায় নামেন। রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বর, শাহআলী প্লাজা মার্কেটের সামনের সড়ক ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯ জুলাই বিকেলে ওই এলাকায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় গুরুতর আহত হন আন্দোলনকারী রুস্তম। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যু আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিহত রুস্তমের পরিবার কাফরুল থানায় মামলা দায়ের করে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের পাশাপাশি আন্দোলন দমন অভিযানে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়।
এনএম জিয়াউল আলম প্রশাসনে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন এবং অবসরের আগে সচিব পদে উন্নীত হন। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সমন্বয়ে তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঘটনাস্থলে গুলিবর্ষণ ও অভিযান পরিচালনায় উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার সূত্র খুঁজে বের করতে জিয়াউল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
এ মামলার তদন্ত দীর্ঘদিন আটকে থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে গতি পেয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রমাণ সংগ্রহ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে মামলায় উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। অপরদিকে প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ গ্রেফতারকে আইনের অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন।
রুস্তম হত্যাকাণ্ড দেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। তার পরিবার ও সহপাঠীরা এখন দ্রুত বিচারের আশায় দিন গুনছেন। মামলার অগ্রগতি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সচিব পর্যায়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলার তদন্তে গ্রেফতার দেখানো একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এটি প্রশাসনিক কাঠামো ও ছাত্র আন্দোলনের দমন-পীড়নের বাস্তবতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। তদন্তের অগ্রগতি প্রমাণ করছে যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়েও বিচার প্রক্রিয়া এগোতে পারে।
