চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো পার্ক এলাকায় নৃশংসতার ঘটনা যেন থামছেই না। সাত বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরা হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই একই পাহাড়ি এলাকা থেকে এবার এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাতে খবরটি জানাজানি হলে এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ইরা হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত
রোববার দুপুরে ইরাকে ইকোপার্কের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সহস্রধারা ঝরনা এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উত্তরের একটি নির্জন পাহাড়ি পথ থেকে তাকে পাওয়া যায়। সে সময় পার্কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গভীরে সড়ক সংস্কারের কাজ চলছিল। এক স্কেভেটর চালক দেখতে পান, রক্তমাখা অবস্থায় একটি শিশু জঙ্গল থেকে টলমল পায়ে রাস্তার দিকে আসছে। শ্রমিকরা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তার গলার ক্ষত কাপড় দিয়ে চেপে ধরে রক্তক্ষরণ বন্ধের চেষ্টা করেন।
প্রথমে তাকে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিল সে। ভোরের দিকে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। অস্ত্রোপচারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হলেও মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ভোর ৫টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শিশুটির গলায় শ্বাসনালী কাটা ছিল এবং হাতে গভীর ক্ষতচিহ্ন ছিল। গলার গুরুতর আঘাতে তার শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার পর থেকেই সে কথা বলতে পারছিল না। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানিয়েছিলেন, গলায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এবং তাকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে যৌন সহিংসতার আলামত পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন।
শিশুটির বড় বোন জান্নাতুল নিশা ইশপা জানান, ভোরের দিকে ইরার অবস্থা আরও খারাপ হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা সব চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারেননি।
মামলা ও তদন্ত
শিশুটির বাড়ি কুমিরা ইউনিয়নের মছজিদদা (মাস্টারপাড়া) এলাকায়। বাড়ি থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার। এত কম বয়সী একটি শিশু কীভাবে ইকোপার্কের এত গভীরে পৌঁছাল, তাকে কেউ তুলে নিয়ে গেছে কিনা, অথবা পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে কিনা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শিশুটির মা রোকেয়া বেগম রোববার রাতেই সীতাকুণ্ড মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বাবু শেখ নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নতুন করে নারীর মরদেহ উদ্ধার
এরই মধ্যে মঙ্গলবার রাতে একই পাহাড়ি এলাকা থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে কাজ শুরু হয়েছে। আগের শিশুহত্যার ঘটনার সঙ্গে নতুন এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তাও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাগুলোর পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পার্কের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।
