কক্সবাজার র্যাব ১৫–এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসানসহ তিন শতাধিক সদস্যকে একযোগে বদলি করার ঘটনাটি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও র্যাবের পক্ষ থেকে এটিকে “নিয়মিত বদলি” বলা হচ্ছে, বিভিন্ন সূত্র, মাঠপর্যায়ের তথ্য ও সাম্প্রতিক দুই বিতর্কিত অভিযান ইঙ্গিত দিচ্ছে — এটির পেছনে গভীরতর অসঙ্গতি ও তদন্তনির্ভর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
গণবদলি: সংখ্যার পেছনে লুকানো বার্তা
মাত্র কয়েক দিনে ধারাবাহিক তিনটি প্রজ্ঞাপনে র্যাব সদর দপ্তর র্যাব-১৫ হওয়ার তিন শতাধিক সদস্যকে বদলি করেছে — যা এ বাহিনীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।
- ১৯ নভেম্বর: ১৯৮ সদস্য
- ১৯ নভেম্বর: আরও ২০০ সদস্য
- ২৭ নভেম্বর: অতিরিক্ত ৭৪ সদস্য
এদের বড় অংশই কক্সবাজার–বান্দরবানকেন্দ্রিক র্যাব-১৫ এর সদস্য।
অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল হাসানকে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করার যুক্তিতে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হলেও ঘটনাটির সময়কাল, সংশ্লিষ্ট অভিযোগ এবং ভেতরে ভেতরে চলমান তদন্ত “রুটিন বদলি” ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
দুই বিতর্কিত অভিযান—গণবদলির নেপথ্যে?
১) কুতুপালং অভিযান — ইয়াবা জব্দে অসঙ্গতি ও তথ্য বিভ্রাট
৭ সেপ্টেম্বর কুতুপালং পশ্চিম পাড়ার একটি ঘরে অভিযান চালিয়ে র্যাব-১৫ দুই নারীকে ৮৯,৬০০ ইয়াবাসহ আটক দেখায়।
অভিযোগ:
স্থানীয় সূত্র বলছে ১ লাখ ১০ হাজার ইয়াবা আত্মসাৎ হয়েছে
নগদ টাকার হিসাবেও অসঙ্গতি
মামলার এজাহারে নাম ও পিতার নাম ভিন্নভাবে লিখে একজন সাংবাদিককে ভুলভাবে আসামি দেখানো
এই ভুল শুধুই মানবিক বিচ্যুতি নয় — বরং উদ্দেশ্যমূলক বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের মতে, এক মাদক ব্যবসায়ী সেলিমকে বাঁচাতে সাংবাদিক সেলিম উদ্দিনকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছে।
র্যাব সদর দপ্তরের তদন্ত টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়— অভ্যন্তরীণ তদন্তই বদলির গতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
২) লেদা অভিযান — ইট ও লাঠির রহস্যজনক “জব্দতালিকা”
২৬ সেপ্টেম্বর টেকনাফের লেদায় কুখ্যাত মাদককারবারি জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার করে র্যাব-১৫।
জব্দ তালিকায় পাওয়া যায়—
- ৭টি ইটের টুকরা
- ২টি কাঠের লাঠি
এমন “অস্বাভাবিক” জব্দতালিকা স্থানীয়দের চোখে আরও সন্দেহ বাড়ায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়, এবং অবশেষে এই ঘটনাও তদন্তের আওতায় আসে।
অভিযান পরিচালনায় একই নেতৃত্ব—প্রশ্ন আরও জোরালো
দুটি বিতর্কিত অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল হাসান।
এছাড়া তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত টেকনাফ এফএস কমান্ডার কর্পোরাল ইমামকেও এই নেপথ্যের অন্যতম চরিত্র হিসেবে স্থানীয়রা চিহ্নিত করেছেন।
এই পুনরাবৃত্ত নেতৃস্থানীয় ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই বদলির পেছনে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
র্যাবের বক্তব্য — ‘নিয়মিত বদলি’, কিন্তু…
র্যাব মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেকাব চৌধুরী বলছেন:
দীর্ঘদিন কর্মরত থাকায় এটি রুটিন বদলি। কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যদিও এই আনুষ্ঠানিক অবস্থান সুরক্ষামূলক, বাস্তবে তথ্যপ্রবাহ বলছে—
- সদর দপ্তর সরেজমিন তদন্ত করেছে
- উচ্চ পর্যায়ে ফলোআপ হচ্ছে
- অভিযোগের গভীরতা অত্যন্ত গুরুতর
ফলে “রুটিন বদলি” বক্তব্যটিকে জনমনে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।
কক্সবাজারের বাস্তবতা — ইয়াবা বাণিজ্যের ছায়া
কক্সবাজারের সীমান্ত অঞ্চল বিশেষ করে টেকনাফ বহুদিন ধরেই ইয়াবা পাচারের অন্যতম রুট।
র্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী এখানে দীর্ঘদিন অভিযান চালালেও- পুনঃপুন বিতর্ক, ভুয়া ক্রসফায়ার অভিযোগ, মামলা জালিয়াতি, জব্দ করা ইয়াবার সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন, এসব ঘটনা জনবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
র্যাব-১৫–এর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয়। এবার এত বড় পরিসরে বদলি হওয়া সম্ভবত সরকারি আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর সংকেত— অসঙ্গতির জন্য শূন্য সহনশীলতা।
বদলি কি সমাধান, নাকি সমস্যার সাময়িক চাপা দেওয়া?
বদলি একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কিন্তু অন্তর্নিহিত দুর্নীতি বা অপব্যবহার রোধে কার্যকর নয়। প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক স্বচ্ছ তদন্ত এবং অভিযানের ভিডিও-ডকুমেন্টেশন বাধ্যতামূলক করা। স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা ছাড়া মাদকবিরোধী যুদ্ধ সফল হতে পারে না।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে কে দোষী—এটি এখনো প্রকাশ হয়নি।
তবে এই গণবদলি র্যাবের ভিতরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই বার্তা দিয়েছে: অনিয়ম করলে রেহাই নেই।
কক্সবাজারে র্যাব-১৫–এর গণবদলির ঘটনা কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়—
এটি মাদকবিরোধী অভিযানের দীর্ঘদিনের সমালোচনা, বিতর্কিত অভিযানসমূহের অভিযোগ এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে।
নতুন অধিনায়ক লে. কর্নেল নেয়ামুল হালিমের দায়িত্ব পাওয়া র্যাব-১৫–এর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—
বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা এবং কক্সবাজারে মাদকবিরোধী প্রচেষ্টাকে স্বচ্ছ, জনবান্ধব ও তথ্যভিত্তিক করা।
এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত র্যাবের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমন আশা জনসাধারণের।
