চানখারপুল হত্যাকাণ্ডের রায়ে ক্ষুব্ধ শহীদ পরিবার ভিডিও ফুটেজ আদালতে উপস্থাপনের পরও তিন বছরের কারাদণ্ড—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে শহীদ আনাসের মায়ের কণ্ঠে। রাজধানীর চানখারপুলে ছয় জন হত্যার মামলার রায় ঘোষণার পর ন্যায়বিচার নিয়ে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদদের পরিবার।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে শহীদ আনাসের মা বলেন,
আমার সন্তানের খুনির ভিডিও ফুটেজ থাকার পরও তার তিন বছরের সাজা হয়—এই রায় কীভাবে যৌক্তিক হতে পারে? অন্তর্বর্তী সরকার থাকতেই যদি বিচার না পাই, তাহলে কবে পাব?
এ সময় অপর শহীদ ইয়াকুবের মা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,
তিন বছর পরে এরা বের হয়ে যাবে। তখন আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে?
কী বলছে আদালতের রায়
বেলা সোয়া ১২টার দিকে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য দুই আসামি হলেন—
সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী
সাবেক এডিসি (রমনা) শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সবাই বর্তমানে পলাতক। আদালত তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্তেরও নির্দেশ দিয়েছেন।
কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকা
এই মামলায় অন্য কয়েকজন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে—
রমনা জোনের সাবেক এসি মোহাম্মদ ইমরুল: ৬ বছর
শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেন: ৪ বছর
কনস্টেবল মো. সুজন, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলাম: ৩ বছর করে
এদের মধ্যে মোহাম্মদ ইমরুলও পলাতক রয়েছেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ ও প্রমাণ
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ‘ওয়ারলেস বার্তার’ মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের পর পুলিশ সদস্যরা চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে গুলি চালায়।
এই অভিযোগের পক্ষে আদালতে ১৯টি ভিডিও ফুটেজ উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন।
মামলার পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালালে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন।
২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় এবং ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ১৪ জুলাই আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
বিচার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে এটি দ্বিতীয় রায়। তবে শহীদ পরিবারগুলোর মতে, ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও হালকা সাজা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রায় ঘোষণার পর তাই আদালত প্রাঙ্গণের বাইরেও প্রশ্ন একটাই—
এই রায় কি সত্যিই ন্যায়বিচার, নাকি ন্যায়বিচারের পথে আরেকটি অসমাপ্ত অধ্যায়?
