বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও গভীর অধ্যায়ের অবসান ঘটল। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
দলীয় ও পারিবারিক সূত্র তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। এর আগে সোমবার গভীর রাতে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, তিনি অত্যন্ত সংকটময় সময় অতিক্রম করছেন। তখন দেশবাসীর কাছে তার সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা করা হয়েছিল।
বেগম খালেদা জিয়াকে গত ২৩ নভেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৭ নভেম্বর তার ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দিলে তাকে কেবিন থেকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি লিভার ও কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আথ্রাইটিসসহ নানা জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছিলেন। সংক্রমণজনিত জটিলতা তার শারীরিক অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়ার পারিবারিক শেকড় বিস্তৃত ফেনী ও পঞ্চগড় অঞ্চলে। জন্মের পর তার নাম রাখা হয়েছিল খালেদা খানম। ছোটবেলায় সৌন্দর্য ও সরলতার কারণে পরিবারের সবাই তাকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন—যা পরবর্তীতে তার ডাকনাম হয়ে ওঠে। প্রাথমিক শিক্ষা নেন সেন্ট যোসেফ কনভেন্টে, পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন।
গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক—এই রূপান্তরের গল্প বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। তার শাসনামল দুই পর্বে বিভক্ত—১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬।
দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় থাকার সময় তার সরকার একের পর এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের মুখে পড়ে। সেই টানাপোড়েনের ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি বড় পরাজয়ের মুখে পড়ে। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকটের মধ্য দিয়ে সময় কাটান।
তবুও বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন দৃঢ় নেতৃত্বের নাম, আর রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি থাকবেন গণতন্ত্রের পক্ষে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে।
তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। বাংলাদেশের রাজনীতি আজ হারাল এক শক্তিশালী, বিতর্কিত কিন্তু অনস্বীকার্য এক অধ্যায়।
