নির্বাচনে সেনাবাহিনী: বিচারিক ক্ষমতা ছাড়া মাঠে নামার প্রশ্নে বিতর্ক

বিবিসি বাংলা নিউজ

5 Min Read

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ভোটের দায়িত্বে থাকবেন বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে আইন সংশোধন করে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর” সংজ্ঞায় যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এবার ভোটের দিন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও পুলিশের মতোই কেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—সেই দায়িত্ব পালনের সময় তাদের হাতে বিচারিক বা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকবে কি না। এই প্রশ্নেই এখন জোর বিতর্ক তৈরি হয়েছে নির্বাচনপূর্ব পরিবেশে।

সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায়

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, আগের আইন অনুযায়ী সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীকে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর সংশোধনের মাধ্যমে সেটি যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ভোটকেন্দ্র ও এর চারশ গজ এলাকার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতোই দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

কিন্তু একই সঙ্গে কমিশন জানায়, সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় যুক্ত করলেও তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের হাতে নেই।

ইসির সদস্য আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন,

আইন অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার ক্ষমতা এখন শুধুমাত্র সরকারের হাতে। ইসির হাতে নয়।

 

সেনাবাহিনীর দাবি: ‘ক্ষমতা না দিলে মাঠে নিয়ন্ত্রণহীনতা তৈরি হতে পারে’

গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নির্বাচনের সময় বিচারিক ক্ষমতা বহাল রাখার দাবি জানানো হয়। তারা যুক্তি দেন, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সেনাবাহিনী বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। ফলে শুধু নির্বাচনের সময় সেই ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হলে কার্যকারিতা ব্যাহত হবে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এমদাদুল ইসলাম বলেন,

এক বছরের বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনী বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে মাঠে আছে। কিন্তু শুধু ভোটের সময় যদি সেই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে এই সেনাবাহিনীকে ভোটের মাঠে রেখে লাভটা কী?

 

কী এই ‘বিচারিক ক্ষমতা’?

‘ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার’ বা বিচারিক ক্ষমতা মানে হলো এমন একটি এখতিয়ার, যার মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাউকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, স্বল্পমেয়াদি সাজা প্রদান, এমনকি প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশও দিতে পারেন।

বর্তমানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭টি ধারার অধীনে সেনা কর্মকর্তারা এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছেন। এর ফলে তারা মাঠে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীদের গ্রেফতার, জামিন বা স্বল্পমেয়াদি সাজা দিতে পারেন।

সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন,

সেনাবাহিনীর সাধারণত কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু বিচারিক ক্ষমতা থাকলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাজা দিতে পারে, জেলে পাঠাতে পারে। ক্ষমতা না থাকলে স্থানীয় প্রশাসনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

অতীতের প্রেক্ষাপট

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে, তবে কখনোই তাদের হাতে বিচারিক ক্ষমতা ছিল না।

এর ব্যতিক্রম ছিল ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’—যেখানে বিশেষ অভিযানে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

সর্বশেষ ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় জরুরি অবস্থার কারণে সেনাবাহিনী আলাদা ক্ষমতা ছাড়াই মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা এখনো বহাল রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতভেদ

নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া যৌক্তিক।
তার ভাষায়—

শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অনেক জায়গায় পুলিশ আগের মতো সবল নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিলে ভালো। চাইলে ইসি সেটা দিতে পারে।

তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এর বিরোধিতা করেছেন।
তিনি বলেন,

যদি নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক হয়, তাহলে সেনাবাহিনীকে আগাম বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই সঠিক হবে।

তার মতে, আগাম এই ক্ষমতা দেওয়া মানে ‘ঢালাও কর্তৃত্ব চাওয়া’, যা নির্বাচনপূর্ব নিরপেক্ষ পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সামনে কী করবে নির্বাচন কমিশন?

ইসি সূত্র জানায়, সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় যুক্ত করায় নির্বাচনের সময় তাদের দায়িত্ব পালনে আলাদা আদেশের প্রয়োজন হবে না। তারা বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কাঠামোর অধীনে কাজ করবে।

তবে সেনাবাহিনীর হাতে বিচারিক ক্ষমতা থাকবে কি না, তা এখন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনীর এই ক্ষমতা নির্বাচনকেন্দ্রিক আস্থা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—অথবা উল্টোভাবে বিতর্কও বাড়াতে পারে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সেনাবাহিনীর বিচারিক ক্ষমতা বিতর্ক আবারও সামনে এনে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন। একদিকে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের যুক্তি, অন্যদিকে নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে এখন ঝুলে আছে সেনাবাহিনীর সেই ‘বিশেষ ক্ষমতা’।

 

সূত্র: বিবিসি বাংলা নিউজ

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *