ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর একটি অভিযানে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার পর দেশটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যেই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, আপাতত ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে চলবে।
মাদুরোকে গ্রেপ্তার এবং ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ—এই দুই বিষয় আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে গুরুতর আইনি প্রশ্ন তুলেছে।
আইনি ব্যাখ্যায় নীরব ট্রাম্প প্রশাসন
ট্রাম্প প্রশাসন এখনো এই অভিযানের পূর্ণাঙ্গ আইনি ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে অতীতের সামরিক ও আইন প্রয়োগমূলক অভিযানের নজির এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর বক্তব্য থেকে প্রশাসনের অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা মিলছে।
১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তারে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। তখন সেটিকে ‘আইন প্রয়োগে সামরিক সহায়তা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। নরিয়েগার মতো মাদুরোর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছে। পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় চালানো অভিযানের উদ্দেশ্যও ছিল বিচার বিভাগের কার্যক্রমে সহায়তা।
যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ভেনেজুয়েলা ‘চালাতে’ পারে
এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলা আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে চলবে এবং দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে তাঁর নির্দেশ মানতে হবে। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রদ্রিগেজ সহযোগিতা করলে সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব যদি যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে, তাহলে কোন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে দেশটি পরিচালিত হবে? এ বিষয়ে ট্রাম্প কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। বরং তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে দেশটির তেলসম্পদের স্বার্থে সামরিক উপস্থিতিতেও তিনি পিছপা হবেন না।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের আপত্তি
নিউইয়র্কের কারডোজো স্কুল অব ল–এর অধ্যাপক রেবেকা ইংবার বলেন, ভেনেজুয়েলা পরিচালনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বৈধ আইনি পথ নেই। তাঁর ভাষায়, এটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ দখলদারত্বের শামিল হতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইনেও প্রেসিডেন্টের এমন ক্ষমতার কোনো সুস্পষ্ট ভিত্তি নেই।
তিনি আরও বলেন, এমন কোনো উদ্যোগ নিতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।
মাদুরোকে গ্রেপ্তার: জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন?
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ কোনো রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে বলে—যদি না তা আত্মরক্ষা, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্মতি অথবা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের আওতায় পড়ে।
মাদুরোকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে এসব শর্তের কোনোটি পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গ্রেপ্তারি অভিযানকে ‘আইন প্রয়োগ’ হিসেবে দেখানো হলেও এটি আত্মরক্ষার পর্যায়ে পড়ে না বলে মত দিয়েছেন অনেক আইনজ্ঞ।
১৯৮৯ সালের পানামা অভিযানের সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল—এই নজিরও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মার্কিন আইনে আন্তর্জাতিক চুক্তির অবস্থান
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তি দেশটির ‘সর্বোচ্চ আইন’-এর অংশ। তবে প্রশাসনের আইনি উপদেষ্টারা দীর্ঘদিন ধরে এমন যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, কিছু ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারেন।
এই তত্ত্ব অতীতে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আইনজীবী ব্রায়ান ফিনুকেইনের মতে, জাতিসংঘ সনদ মানা প্রেসিডেন্টের বাধ্যবাধকতা—আদালত আদেশ দিক বা না দিক।
ভেনেজুয়েলায় হামলা ও ‘সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতা’
মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইনের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদুরোকে গ্রেপ্তারে ব্যবহৃত হেলিকপ্টারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করা হয়। এ ঘটনায় কারাকাসে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ভিডিও ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি প্রশ্ন তুলেছেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এই হামলার সাংবিধানিক ভিত্তি কী। পরে মার্কো রুবিও তাঁকে জানান, এটি ছিল অভিযানে অংশ নেওয়া মার্কিন সদস্যদের আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা—যা প্রেসিডেন্টের ‘সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতা’র আওতায় পড়ে।
মাদুরোর স্ত্রী ও আদালতের এখতিয়ার
মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে, যদিও তিনি আগের অভিযোগপত্রে ছিলেন না। পরে নতুন অভিযোগপত্রে তাঁকে আসামি করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রেপ্তারের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হলেও মার্কিন আদালত সাধারণত সে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। আদালতের প্রচলিত নীতিমতে, আসামি কীভাবে আদালতে এসেছেন, তা নয়—উপস্থিতিই বিচার শুরুর জন্য যথেষ্ট।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়মুক্তি পাবেন কি মাদুরো
আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিদেশি আদালতে বিচার থেকে সুরক্ষা পাওয়ার একটি নীতি রয়েছে। তবে এই ছাড় পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রপ্রধান হতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বরং ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তিনি একজন অপরাধী চক্রের নেতা। অতীতে পানামার নেতা নরিয়েগার ক্ষেত্রেও একই যুক্তিতে দায়মুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টও সম্ভবত এই অবস্থানই নেবে এবং মাদুরো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কোনো বিশেষ ছাড় পাবেন না।
