সোমবার সকালটা ছিল শান্ত, প্রতিদিনের মতোই। সূর্যের আলোয় স্নান করা স্কুল চত্বরে প্রাথমিকের শিশুরা বসেছিল পাঠদানে মনোযোগী হয়ে। তৃতীয় শ্রেণির ক্লাস চলছিল। শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, ছাত্ররা খাতায় টুকে নিচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ ঘণ্টা বাজবে— ঘরে ফিরবে সবাই।
কিন্তু সেই ঘণ্টা আর বাজেনি।
বাজল বিকট এক বিস্ফোরণ।
আচমকা এক গর্জন যেন আকাশ ফুঁড়ে নেমে এলো— তারপর মুহূর্তেই আছড়ে পড়ল বিমান। প্রজেক্ট-৭ ভবনে প্রথম ধাক্কা, সেখান থেকে জ্বালানির লিকেজ— এবং এরপর প্রজেক্ট-২ ভবনের সামনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
ধোঁয়া, আগুন, আর আর্তনাদে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে স্বাভাবিকতা। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শ্রেণিকক্ষের সামনে গিয়ে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। শিশুরা ক্লাসে বসা, কেউ সবে কলম ধরেছে, কেউ তাকিয়ে আছে জানালার দিকে— এক সেকেন্ডেই সব ছিন্নভিন্ন।
শ্রেণিকক্ষ থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসছিল শিশুরা। কেউ পৌঁছেছিল দরজায়, কেউ উঠেছিল বেঞ্চ থেকে— কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখা তাদের আটকে দেয়।
এই ভবনে ছিল মোট ১৬টি ক্লাসরুম এবং ৪টি শিক্ষক কক্ষ। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস চলত এখানে। ওই সময় ক্লাস প্রায় শেষের পথে। কিন্তু ক্লাস শেষ হয়নি— হয়ে গেল জীবনের একটি অধ্যায়।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন এক মা। হাতে সন্তানের স্টুডেন্ট আইডি কার্ড। মুখে কেবল একটাই বাক্য— “সকালেই স্কুলে দিয়ে এলাম, এখন খুঁজছি তার নাম…”
এভাবে কাঁদছেন বহু মা-বাবা। কেউ হাহাকার করছেন, কেউ নিঃশব্দে বসে আছেন— জানেন না সন্তান জীবিত, না মৃত।
বিধ্বস্ত বিমানটি ছিল একটি প্রশিক্ষণ বিমান— এফ-৭ বিজেআই মডেলের। দুর্ঘটনায় পাইলটসহ অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত বহু শিশুকে হেলিকপ্টারে করে নেওয়া হচ্ছে হাসপাতালে।
ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট, সেনাবাহিনী, বিজিবি, ও নৌবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছেন। গোটা এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছে নিরাপত্তার চাদরে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কণ্ঠে ধরা পড়েছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।
“আমরা ভাবছিলাম ভূমিকম্প হচ্ছে… তারপর দেখি জানালার বাইরে আগুন। ছেলেমেয়েরা চিৎকার করছে, কোথাও পালাবার পথ নেই।”
এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে শিশুমন আর তাদের পরিবারে যে ক্ষত তৈরি হলো, তা সহজে শুকাবে না।
সোমবারের সকাল যেমন শুরু হয়েছিল, বিকেলটা ততটাই অন্ধকারে শেষ হলো।
স্কুলের শেষ ঘণ্টা আর বাজেনি— কারণ অনেক শিশুর পক্ষে আর কোনো দিন ক্লাসে ফেরা সম্ভব নয়।
