মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের নির্ভরতার প্রতীক

লেখক: এস এম দানিয়ানুল আলম ফারসি

7 Min Read
Highlights
  • মিজানুর রহমান ভুঁইয়া মিল্টন
  • চট্টগ্রাম-৩ সংসদীয় আসন

সাগরের বেষ্টনে সবুজ ঘোমটাবৃত দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। উহার অন্তর্গত বাউরিয়া ইউনিয়নের স্বনামধন্য হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া বাড়ীতে ১৯৬৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি এক সংগ্রামী পথচলার নাম, এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপ কেবল পদ-পদবির নয়, মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ও নিবেদনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শিকড়ের টান ও রাজনীতিতে হাঁটাহাঁটি: মিল্টন ভূঁইয়ার শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাউরিয়ার মাটিতে নিজ বাড়ীতে। এখানেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি। মায়ের দিকে বাটাজোড়ার প্রখ্যাত জমিদার হাজী ওয়াসিল মালাদারের জীন বহন করছেন তিনি। ১৯৮১ সালে কলেজ ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতির মঞ্চে প্রবেশ করেন তিনি এবং তখন থেকেই জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি ছিলো তাঁর সুগভীর অনুরাগ।

প্রবাসে থেকেও প্রানের টানে বাংলাদেশ: ১৯৮৪ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। কিন্তু বিদেশ বিভুঁইয়ে থেকেও রাজনীতির প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতা এতটুকুও কমেনি। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির প্রথম কমিটি গঠিত হলে তিনি সদস্য হিসেবে যুক্ত হন এবং নেতৃত্ব দেন তৎকালীন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের অধীনে। এরপর ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান এবং পরবর্তী ১৫ বছর সে দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। ২০০১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন কমিটির নর্থ আমেরিকার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা ও ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালের ৩ মার্চ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশনায়ক তারেক রহমান তাকে “জাতীয় নেতৃত্বে” অন্তর্ভূক্ত করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির বলিষ্ঠ কণ্ঠ: দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও তিনি ছিলেন দেশের রাজনৈতিক সংকট ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের অগ্রভাগে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও অব্যাহত প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। হোয়াইট হাউস, ইউএস সিনেট, স্টেট ডিপার্টমেন্টসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন।

সেখানে অবস্থানরত বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে জনাব মিল্টন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সিনেটে বাংলাদেশে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো বারবার উপস্থাপিত হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন, সহকারী সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু ও মার্কিন সিনেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ ও দেনদরবার করে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের পরে তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অন্যায় গ্রেফতারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণেও তিনি ছিলেন নিরলস অকুতোভয় যোদ্ধা।

মিথ্যা মামলা, নির্বাসন ও আন্দোলন: বিএনপির হয়ে তার এমন টর্নেডোসম ভুমিকায় ভীত হয়ে স্বৈরাচারী সরকার তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে! অভিযোগ ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টা। এ মিথ্যা মামলার কারণে তাঁকে দীর্ঘ ৯ বছর নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয় যুক্তরাষ্ট্রে। আর্থিক ও মানসিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ততার শিকার হন। তিনি এই সময়টাকে পুরোপুরি কাজে লাগান স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বিদেশীদের জনমত গড়ে তোলার কাজে, নিজেকে প্রমাণ করেন দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সক্রিয় আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে বিএনপির আন্তর্জাতিক অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেন।

তিনি একাধিকবার মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—বিশেষ করে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু-এর সঙ্গে। রাইট টু ফ্রিডম, হোয়াইট হাউস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংকট ও রাজনৈতিক দমননীতির বিস্তারিত তুলে ধরেন। শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগেই থেমে থাকেননি, আন্দোলনের সময় সন্দ্বীপে গ্রেফতার হওয়া বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীদের আইনি ও পারিবারিক সহায়তা দেওয়ার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন।

দেশে প্রত্যাবর্তন ও মানুষের ভালোবাসা: ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট, দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তিনি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করে জামিন লাভ করেন। তিনি বলেন, “আমি সন্দ্বীপ থেকে কিছু নিতে আসিনি, এসেছি আপনাদের জন্য কিছু দিতে।” এর মাত্র ১০ দিন পর, ৫ সেপ্টেম্বর, গুপ্তছড়া ঘাটে তাঁর আগমনে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ ভিড় করে তাঁকে বরণ করতে! এ যেন নেতৃত্ব আর মানুষের হৃদয়ের এক পুনর্মিলন।

সামাজিক কর্মকান্ড ও উন্নয়নের পদচিহ্ন: মিল্টন ভূঁইয়ার রাজনীতি কেবল প্রতিশ্রুতিতে নয়, কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করেছে। তারই আপন খালাতো ভাই সন্দ্বীপের বাতিঘর অন্তর্তীকালীন সরকারের মাননীয় উপদেষ্টা জনাব ফাওজুল কবির খাঁনকে বাঁশবাড়িয়া-গুপ্তছড়া ফেরী, সন্দ্বীপের আভ্যন্তরীন রাস্তা সহ বহুবিধ সমস্যা সমাধানের জন্য যারপরনাই উদ্বুদ্ধ করেন। এমনকি উপদেষ্টা মহোদয়ের সাথে এসব ব্যাপারে আঠার মতো লেগে থাকেন। অবশেষে ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে বহুল প্রতীক্ষিত স্বপ্নের ফেরিঘাট নির্মাণের কাজ মাননীয় উপদেষ্টা সকাশে উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে উপদেষ্টা মহোদয়কে ননস্টপ অনুরোধ করে প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকার তালিকায় আনিয়ে নেন।

বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘরে আলো পৌঁছানোয় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। শিক্ষার উন্নয়নে ইংলিশ অলিম্পিয়াড ও মেধাবৃত্তি পরীক্ষার সূচনা তার আরেকটি সৃজনশীল কার্যক্রমের অংশ। ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪, আয়োজন করেন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও শীতবস্ত্র বিতরণ। ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ বিশাল ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেন, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকার মেয়র ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন।
১০ মে তরুণদের জন্য ‘তৃষ্ণার উপহার’ হিসেবে পানির বোতল বিতরণ করেন। ২৭ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ফেরি, নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবা ইস্যুতে দৌড়ঝাঁপ করেন। ৬ জুন শহীদ সাইমনের পরিবারকে কুরবানির উপহার দেন এবং ৮ জুন নিজ বাড়িতে পাঁচ হাজার মানুষের জন্য গণভোজের আয়োজন করেন।

জননিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলায় জিরো টলারেন্স: সন্দ্বীপে সন্ত্রাস, ভূমিদখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তিনি গ্রহণ করেন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। দলের কেউ হোক বা আত্মীয়, অপরাধের ক্ষেত্রে কারো জন্যই ছাড় নেই, এমন কঠোর অবস্থানই তাঁকে জনগণের কাছে একজন সাহসী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ভবিষ্যতের সংকল্প: তিনি বিশ্বাস করেন, সন্দ্বীপ শুধু একটি দ্বীপ নয়, একটি সম্ভাবনার নাম। তাই আগামী দিনে তাঁর লক্ষ্য:-

শিক্ষা: মানসম্মত শিক্ষা, ইংরেজি ও আইসিটি কোর্সের বিস্তার।
স্বাস্থ্যসেবা: আধুনিক হাসপাতাল, ক্লিনিক, টেলিমেডিসিন সুবিধা।
যুব উন্নয়ন: স্টেডিয়াম, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান।
মাদকমুক্ত সমাজ: একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলা।

সামনে নির্বাচন, এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তি সাপেক্ষে বিএনপির প্রতীক “ধানের শীষ” নিয়ে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এটি কেবল একটি ব্যক্তির নির্বাচন নয়, এটি সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপ্রাপ্তি ও উন্নয়নবঞ্চনার বিরুদ্ধে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।

মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন; এই নামটি আজ সন্দ্বীপবাসীর জন্য এক আশা আকাঙ্খার প্রতীক, এক নির্ভরতার নাম। তিনি নেতা নন, হয়ে উঠেছেন গনমানুষের আত্মার আত্মীয়।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *