পর্যটন নিয়ন্ত্রণেও থামেনি দূষণ, সংকটে সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় মানুষের জীবন

ছিদ্দিকুর রহমান, কক্সবাজার প্রতিনিধি

3 Min Read

পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটন সীমিত করার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে এর সুফল খুব একটা মিলছে না—বরং চরম সংকটে পড়েছে দ্বীপের স্থানীয় জনগোষ্ঠী। পরিবেশদূষণ যেমন নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তেমনি পর্যটননির্ভর অর্থনীতি ভেঙে পড়ায় জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে দ্বীপবাসীর।

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে সরকার ২০২৪ সাল থেকে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা কার্যকর করে। এর আওতায় দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক এবং বছরে মাত্র দুই মাস—ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। নভেম্বর মাসে রাত্রিযাপনের নিষেধাজ্ঞার কারণে কার্যত কোনো পর্যটকই দ্বীপে যাননি।

নিয়ন্ত্রণেও বাড়ছে দূষণ

সরকারি বিধিনিষেধ সত্ত্বেও দ্বীপজুড়ে পরিবেশদূষণ থামেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সৈকত ও সড়কের পাশে যত্রতত্র প্লাস্টিক ও পলিথিনের স্তূপ দেখা যাচ্ছে। নেই কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন কিংবা নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। পাশাপাশি অব্যাহত রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত কটেজ নির্মাণ ও কেয়াগাছ নিধন।

চরম দুর্ভোগে পর্যটকরা

কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে জাহাজ চলাচল করায় বাঁকখালী নদীর জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করছে যাত্রাসূচি। ফলে অনেক সময় পর্যটকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সেখানে নেই যাত্রী ছাউনি, বিশ্রামাগার, পাবলিক টয়লেট কিংবা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা। শীতের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্কদের এভাবে অপেক্ষা করতে হওয়ায় তৈরি হচ্ছে অমানবিক পরিস্থিতি।

ট্রাভেল পাস নিয়ে ক্ষোভ

পর্যটন নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে চালু করা ট্রাভেল পাস ব্যবস্থাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। পর্যটক ছাড়াও ট্যুর অপারেটর, সাংবাদিক, বিনিয়োগকারী এবং কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য ট্রাভেল পাস বাধ্যতামূলক করায় ক্ষুব্ধ সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়দের দাবি, আত্মীয়স্বজন বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে দ্বীপে যেতে হলেও তাঁদের পর্যটক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে দ্বীপবাসী

সেন্ট মার্টিনের প্রায় সাড়ে বারো হাজার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস ছিল পর্যটন। কিন্তু সীমিত পর্যটনের কারণে অধিকাংশ স্থানীয় পরিবার এখন কার্যত বেকার। স্থানীয়দের মালিকানাধীন সাধারণ মানের হোটেল ও বাসাবাড়ির অর্ধেকের বেশি এ মৌসুমে ভাড়া যায়নি। বিপরীতে ঢাকার বড় বিনিয়োগকারীদের পরিচালিত রিসোর্টগুলো আগেই বুকিং হয়ে যাচ্ছে।

ফলে ২ মাসের আয়ে ১০ মাস চলা দ্বীপবাসীর পক্ষে বর্তমান বাজারদরে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে জমি, বসতভিটা ও অলংকার বিক্রি করে দিন পার করছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও। দ্বীপে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, নেই কোনো কলেজ বা পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্র। শিক্ষার্থীদের টেকনাফে গিয়ে থাকা-খাওয়ার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

চিকিৎসাব্যবস্থাও বেহাল। ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসক সংকটে তা কার্যত অচল। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই এখন আর কক্সবাজার বা টেকনাফে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারছেন না।

স্থানীয়দের দাবি

দ্বীপবাসীরা পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা চান। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের দাবি তুলেছেন তারা। বিদ্যুৎ, সি-অ্যাম্বুলেন্স, খাদ্যগুদাম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের মতে, পর্যটন সীমিতকরণ এককভাবে চাপিয়ে না দিয়ে দ্বীপের মানুষকে সঙ্গে নিয়েই সেন্ট মার্টিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা জরুরি।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *