কয়েক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প শেষে কক্সবাজার বিমানবন্দর এখন আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত। রানওয়ে সম্প্রসারণ ও নতুন টার্মিনাল ভবনের কাজ প্রায় শেষ, আর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সংস্থাগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে বিমানবন্দরটির নতুন মর্যাদার কথা। তবে এত বিপুল বিনিয়োগের পরও কোনো এয়ারলাইনস এখনো কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক রুট চালুর ঘোষণা দেয়নি।
৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে বিমানবন্দরের রানওয়ে ৬,৭৭৫ ফুট থেকে বাড়িয়ে ৯,০০০ ফুট করা হয়েছে, প্রস্থও বেড়ে হয়েছে ২০০ ফুট। আরেক প্রকল্পে একে সমুদ্রের ভেতর ১০,৭০০ ফুট পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ চলছে, যাতে ওয়াইড-বডি এয়ারক্রাফট সহজে উঠানামা করতে পারে।
এদিকে, ৩৬২ কোটি টাকার ব্যয়ে নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ভবনের কাজ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। নতুন টার্মিনালে বছরে ১৮ লাখ যাত্রী সেবা নিতে পারবেন, যা বর্তমান সক্ষমতার দ্বিগুণ।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (আইসিএও) ইতোমধ্যেই অবহিত করা হয়েছে। ২ অক্টোবর থেকে বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাবে।
তিনি বলেন, “আমরা ইউএস-বাংলা, বিমান বাংলাদেশসহ কয়েকটি বিদেশি এয়ারলাইনের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে তারা এখনও স্থাপনাটি পরিদর্শন না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।” তার আশা, অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই সীমিত আকারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু হতে পারে।
বর্তমানে চারটি স্থানীয় এয়ারলাইন—বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা—কক্সবাজারে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে আন্তর্জাতিক রুট চালুর বিষয়ে তারা এখনো দ্বিধায়।
ইউএস-বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম জানান, ঢাকা–কক্সবাজার–ব্যাংকক রুট বিবেচনায় রয়েছে, তবে পর্যাপ্ত যাত্রী না পেলে ট্রানজিট খরচ মেটানো কঠিন হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও জানিয়েছে, তারা সম্ভাবনা যাচাই করছে।
এয়ারলাইন্স অপারেটরস কমিটির সভাপতি দিলরুবা আখতার বলেছেন, “এখনো কোনো এয়ারলাইনস ফ্লাইট শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।”
শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কক্সবাজার থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক রুট—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের—এখনও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করার মতো ব্র্যান্ডিং, অবকাঠামো ও বিনোদন সুবিধা কক্সবাজারে গড়ে ওঠেনি।
ইউএস-বাংলার কামরুল ইসলাম বলেন, “নেপালের কোনো সমুদ্রসৈকত নেই, অথচ তারা নিজেদের দারুণভাবে ব্র্যান্ড করেছে। কক্সবাজারও এভাবে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করা গেলে পর্যটক পাওয়া সম্ভব।”
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) উদ্যোগে টেকনাফ, মহেশখালী ও সোনাদিয়ায় তিনটি ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা হলেও ৯ বছরেও একটি সম্পন্ন হয়নি। সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণে অগ্রগতি নেই। সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক প্রকল্প আবার পরিবেশগত কারণে বাতিল হয়েছে।
বেবিচক বলছে, ফ্লাইট সংখ্যা শুরুতে সীমিত থাকলেও ধীরে ধীরে বাড়বে। সরকার ৪৮ ঘণ্টার ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করছে, যা বিদেশি পর্যটক বাড়াতে সহায়ক হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক হাব বানাতে হলে পর্যটন অবকাঠামো, ব্র্যান্ডিং ও বিনোদন সুবিধা দ্রুত উন্নত করতে হবে, নইলে বিমানবন্দরের বহুমূল্য অবকাঠামো বিনিয়োগ যৌক্তিকতা হারাতে পারে।
