মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে ইসরায়েলের সর্বশেষ সামরিক অভিযান। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের শীর্ষ নেতাদের বৈঠককে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী বিমান হামলা চালায়। বৈঠকটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত সর্বশেষ গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা নিয়ে।
হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হন, যাদের মধ্যে দুজন কাতারি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলেন। তবে হামাস দাবি করেছে, তাদের নেতৃত্ব এ হত্যাচেষ্টা থেকে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গেছে। এ হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল যে শুধু গাজার সীমানায় নয়, বরং গোটা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে আঘাত হানছে—তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বুধবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি এক সাক্ষাৎকারে হামলাকে কেবল কাতারের ওপর নয়, পুরো গালফ অঞ্চলের জন্য একটি হুমকি বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, দোহায় ইসরায়েলের আক্রমণ শান্তি প্রতিষ্ঠার সব সম্ভাবনাকে নষ্ট করার অপচেষ্টা। তার ভাষায়, আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিতভাবেই আসবে এবং তা নিয়ে কাতার ইতোমধ্যে প্রতিবেশী ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে অভিযুক্ত করে বলেন, নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে গোটা অঞ্চলকে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
দোহায় হামলার পর আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা দ্রুত কাতারে পৌঁছে সংহতি প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে ফোন করে এ হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং কাতারের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কাতারে শিগগিরই একটি আঞ্চলিক বৈঠক আহ্বান করা হবে, যেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ অনুসন্ধান করা হবে। ইতোমধ্যে একটি আঞ্চলিক আইনজীবী দল গঠন করা হয়েছে যারা এ বিষয়ে সম্ভাব্য মামলা প্রস্তুত করছে।
এদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম হামলাকে গালফ দেশগুলোর জন্য সরাসরি হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, কাতারে ইসরায়েলের আক্রমণ প্রমাণ করে যে, যদি আঞ্চলিক প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে পরাস্ত করা যায় তবে তেলসমৃদ্ধ গালফ দেশগুলোকেও ছাড় দেওয়া হবে না। তার দাবি, ইসরায়েল বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে একটি “গ্রেটার ইসরায়েল” গড়ার পরিকল্পনা করছে, যা পশ্চিম তীর, গাজা, লেবানন, সিরিয়া, মিসর ও জর্ডানের অংশ অন্তর্ভুক্ত করে। এ ধারণাটি ইসরায়েলি অতিউদারপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন হলেও সাম্প্রতিক হামলাগুলো তা নতুনভাবে দৃশ্যমান করেছে।
গালফ অঞ্চলে এই অস্থিরতার পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসী অভিযানও চলছে অব্যাহতভাবে। বুধবারের হামলায় গাজায় আরও ৭২ জন নিহত হয়েছেন। অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৬৫৬ জনে। ইসরায়েল বর্তমানে গাজা সিটি দখলের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে, যেখানে এক মিলিয়নেরও বেশি ফিলিস্তিনি বাস করে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, দোহায় হামলার উদ্দেশ্য কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা নয়, বরং গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার সব সম্ভাবনাকে ধ্বংস করা। তিনি আরও বলেন, হামাস নেতাদের উপস্থিতি কারও কাছে গোপন ছিল না; এটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দুপক্ষই জানত। ফলে এ হামলার মাধ্যমে নেতানিয়াহু কার্যত গাজায় জীবিত থাকা ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তির আশা পর্যন্ত হত্যা করেছেন।
সর্বশেষ এই ঘটনাটি প্রমাণ করছে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এখন কেবল সীমান্তের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। গালফ অঞ্চলের নিরাপত্তা যে আর শুধু স্থানীয় ইস্যু নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে, তা এখন স্পষ্ট। কাতারের নেতৃত্বে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া কতটা কার্যকর হবে এবং ইসরায়েলকে কতটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে—এখন পুরো অঞ্চল সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
