জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে। ফলে আলোচনায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
বিএনপি তাদের অবস্থানে স্পষ্ট করে জানায় যে, সংবিধান সংশোধন শুধুমাত্র আগামী জাতীয় সংসদের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। দলটির মতে, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ বা গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন আইনি বৈধতা পাবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদ ছাড়া সংস্কার কার্যকর করা হলে দেশে দ্বৈত সংবিধান চালু হবে এবং তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তিনি প্রস্তাব দেন, রাজনৈতিক দলগুলো এখনই প্রতিশ্রুতি দিক যে নির্বাচনী ইশতেহারে সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং পরবর্তী সংসদে তা কার্যকর করা হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন অবস্থান নেয়। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংসদের হাতে সংস্কার ছেড়ে দেওয়া মানে হবে গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি অবিচার। তাঁর মতে, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং প্রয়োজনে গণভোটও আয়োজন করা যেতে পারে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭৭ সালের গণভোটের দৃষ্টান্ত টেনে তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে এ ধরনের পথ অনুসৃত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সনদের আইনি ভিত্তি না থাকলে গোটা প্রক্রিয়া অর্থহীন হয়ে পড়বে এবং তা দেশের জন্য অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে।
এনসিপি আবার ভিন্নতর অবস্থান নেয়। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন জানান, সংস্কার বাস্তবায়নের একমাত্র টেকসই উপায় হলো নতুন সংবিধান প্রণয়ন। তাঁর মতে, বিদ্যমান সংবিধানকে সামান্য ঘষামাজা করে সংস্কার করা হলে তা ভবিষ্যতে সরকারের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে আলোচনায় জানানো হয় যে, জুলাই সনদের বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞরা চারটি বিকল্প পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন—অধ্যাদেশ, নির্বাহী আদেশ, গণভোট এবং বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ। তবে সংবিধান-সংশ্লিষ্ট নয় এমন প্রস্তাব বাস্তবায়নে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা যাবে।
আলোচনার শেষে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই সনদের চূড়ান্ত খসড়া দলগুলোর হাতে দেওয়া হয়েছে। এখন দলগুলোকে সনদে স্বাক্ষরের জন্য দুজন প্রতিনিধির নাম পাঠাতে বলা হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে অনৈক্যের কারণে সব দল সনদে সই করবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। তিনি জানান, আগামী রোববার আবার বৈঠক হবে, যেখানে সমঝোতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে—সনদের আইনি ভিত্তি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? কারণ, একদিকে বিএনপি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তি তুলছে, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি চাইছে অবিলম্বে আইনি ভিত্তি তৈরি করে নির্বাচন-পূর্ব বাস্তবায়ন। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন শুধু সংস্কার নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
