ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে অনড় অবস্থান বজায় রেখে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) নতুন করে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। চিঠিতে ভেন্যু পরিবর্তনের বিষয়টি আইসিসির স্বাধীন বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটির (ডিসপিউট রেজুলেশন কমিটি—ডিআরসি) কাছে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিসিবির আশা—আইসিসি তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে বিষয়টি ডিআরসিতে পাঠাবে। স্বাধীন আইনজীবীদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি আইসিসি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকে।
ডিআরসি কী এবং কীভাবে কাজ করে
আইসিসির ডিসপিউট রেজুলেশন কমিটি একটি স্বাধীন সালিসি সংস্থা, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করে। আইসিসি, সদস্য বোর্ড, খেলোয়াড়, ম্যাচ কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষ—সবাই অভ্যন্তরীণ সব পথ শেষ হওয়ার পর এই কমিটির শরণাপন্ন হতে পারে।
ইংল্যান্ডের আইনের আওতায় লন্ডনে বসে ডিআরসি গোপন সালিসি কার্যক্রম পরিচালনা করে। স্বাধীন প্যানেলের মাধ্যমে তারা আইসিসির সিদ্ধান্ত, বিধিমালা ও চুক্তির আইনগত বৈধতা ও ব্যাখ্যা মূল্যায়ন করে। ডিআরসি কোনো আপিল ফোরাম নয়; তাদের রায় চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ সরকার ও বিসিবি পুনরায় স্পষ্ট করেছে, ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নিরাপত্তাজনিত এবং এটি একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।
আইসিসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশ যে নিরাপত্তা উদ্বেগ তুলেছে, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা না করে আইসিসি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আসিফ নজরুল বলেন,
ভারতে খেলতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি একেবারেই বদলায়নি। এই উদ্বেগ বাস্তব একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে—যেখানে আমাদের দেশের একজন শীর্ষ খেলোয়াড়কে উগ্রবাদীদের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করা হয় এবং কার্যত ভারত ছাড়তে বলা হয়।
আইসিসির বক্তব্য
এর আগে বুধবার আইসিসির বোর্ড সভায় বিসিবির ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ নাকচ করা হয়। সভা শেষে আইসিসি জানায়, সূচি অপরিবর্তিত থাকবে এবং বাংলাদেশ দল ভারতে যাবে কি না—সে বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।
আইসিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ভেন্যু ও সূচি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নিরপেক্ষ নিরাপত্তা মূল্যায়ন, আয়োজক দেশের নিশ্চয়তা এবং টুর্নামেন্টের অংশগ্রহণ শর্ত অনুযায়ী, যা সব দলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
আইসিসির মতে, বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে যদি এমন কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন না থাকে, যা পরিস্থিতিকে গুরুতরভাবে বিপজ্জনক প্রমাণ করে, তাহলে ম্যাচ স্থানান্তর সম্ভব নয়। এতে টুর্নামেন্টের সূচি, লজিস্টিক এবং আইসিসির নিরপেক্ষতা নিয়েও জটিলতা তৈরি হবে।
বাংলাদেশের ম্যাচ সূচি
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ রয়েছে ‘গ্রুপ সি’-তে। একই গ্রুপে আছে ইংল্যান্ড, ইতালি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নেপাল। বাংলাদেশের প্রথম তিনটি ম্যাচ হওয়ার কথা কলকাতায় এবং শেষ ম্যাচটি মুম্বাইয়ে। ৭ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনী দিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা রয়েছে বাংলাদেশের।
সংকটের শুরু যেখান থেকে
আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার দাবিতে ভারতের কয়েকটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকি-ধামকির পর ৩ জানুয়ারি বিসিসিআই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে মোস্তাফিজকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেয়। এরপরই প্রশ্ন ওঠে—যারা একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, তারা কীভাবে পুরো একটি দলকে নিরাপত্তা দেবে?
৪ জানুয়ারি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে বিসিবি আইসিসিকে জানায়, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ দল ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলবে না। একাধিক বৈঠক হলেও সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি বিসিবি। যদিও আইসিসি মোস্তাফিজ ইস্যুকে বিশ্বকাপের সামগ্রিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মানতে নারাজ।
