ধারাবাহিক সহিংসতায় উদ্বেগ: রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলল আট সংস্থা ও ৪৬ নাগরিক প্রতিনিধি

ফরহাদ হোসেন, ঢাকা প্রতিনিধি

4 Min Read

দেশজুড়ে সাম্প্রতিক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিক সমাজের আটটি সংস্থা ও নেটওয়ার্ক এবং ৪৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক।

এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং নাগরিক নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে।

বিবৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং ময়মনসিংহে শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা। একইসঙ্গে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিসরে একের পর এক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের বিষয়টি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।

বিবৃতিদাতারা বলেন, ধারাবাহিকভাবে এসব ঘটনায় মানবিকতার অভাব এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা শুধু জনজীবনকে অনিরাপদ করে তুলছে না, বরং আসন্ন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান বিচারিক অগ্রগতি না থাকায় বিচারহীনতার আশঙ্কা বাড়ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে হাদির ওপর হামলা এবং তার দেয়া শেষ বার্তার অবমাননা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দিকটিই স্পষ্ট করে বলে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীতে সংঘটিত হামলার ঘটনায় সময়মতো কার্যকর নিরাপত্তা না দেওয়ার বিষয়েও কড়া সমালোচনা করা হয়। বিবৃতিদাতাদের মতে, এসব হামলা কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, বরং মুক্ত গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর সরাসরি আঘাত।

ময়মনসিংহে শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডকে মব সহিংসতার ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, সংখ্যালঘু সুরক্ষায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এখানে স্পষ্ট। তারা এই হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত, অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একইসঙ্গে দীপু দাসের পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, হাদি হত্যাকাণ্ডে নিয়মিত তদন্ত অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় গাফিলতি থাকলে দায় নির্ধারণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় উসকানিদাতা, সংগঠক ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে স্পষ্ট নিরাপত্তা প্রোটোকল চালু করতে হবে।

একইসঙ্গে আগাম সতর্কতা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন এবং কার্যকর কমান্ড সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধ ও সুরক্ষা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান উন্নতির দাবি জানানো হয়। অনলাইন ও অফলাইনে ঘৃণাভাষণ ও সহিংসতা উসকে দেওয়া ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থার কথা বলা হয়।

রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, প্রকাশ্যে সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করে শান্তি, সংযম, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, মুক্ত গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিসরের নিরাপত্তা এবং নির্বাচন স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার জানাতে হবে। দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তি বা সমর্থকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণাও দিতে বলা হয়।

যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন সিএসও অ্যালায়েন্সের সহ-আহ্বায়ক সারা হোসেন ও আসিফ সালেহ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী, মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, সুমাইয়া ইসলাম, রাফিয়াত রশিদ মিথিলা, আজমেরী হক বাঁধন, গীতি আরা নাসরীন, শাহীন আনাম, অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন, ড. দিনা এম সিদ্দিকী, মাহরুখ মহিউদ্দিন, ডা. মো. খাইরুল ইসলাম, কাজী মারুফুল ইসলাম, কে এ এম মোর্শেদ, সাঈদ আহমেদ, সালমা মাহবুব, মুরশেদ আলম সরকার, মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, কাশফিয়া ফিরোজ, কবিতা চাকমা, এ কে এম মাজহারুল ইসলাম, হাসান তালুকদার, ইসমাইল সাদী, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, মার্জিয়া রহমান, কাজলী সেহরীন ইসলাম, সুমন সাজ্জাদ, সানাইয়া ফাহীম আনসারী, ফাতেমা শুভ্রা, কামাল চৌধুরী, আ-আল মামুন, রাইয়ান রাজী, অলিউর সান, তানভীর সোবহান, তাহমিনা খানম, সৌমিত জয়দ্বীপ, হানিয়্যুম মারিয়া খান, কাজী শুসমিন আফসানা, সিরাজাম মুনিরা, সৌভিক রেজা, হাসান তৌফিক ইমাম এবং মাইদুল ইসলামসহ আরও অনেকে।

বিবৃতিদাতারা বলেন, এখনই যদি রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যম সম্মিলিতভাবে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তবে জনআস্থা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আরও গভীর সংকটে পড়বে—যার দায় কেউ এড়াতে পারবে না।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *