ঢাকা শহরের বহুল প্রতীক্ষিত পাতাল ও উড়াল মেট্রোরেলের (MRT Line-1 ও MRT Line-5 North) নির্মাণকাজ প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতার কারণে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। প্রকল্প দুটি নিয়ে জাপানের উদ্বেগ এখন স্পষ্ট। সম্প্রতি জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাসহ একাধিক উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো এক চিঠিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিঠিতে রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন,
জাপান এই দুই প্রকল্পকে বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতার ‘ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ’ হিসেবে বিবেচনা করে। এসব প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন হলে ঢাকার নগর পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।
তবে চিঠিতে রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করে জানান যে,
বিভিন্ন প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি আশানুরূপ নয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ ব্যবহারে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়,
MRT Line 1 প্রকল্প এখনও আর্থিকভাবে টেকসই, যদিও মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও নকশাগত সমন্বয়ের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে।
রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্রুত অনুমোদনের অনুরোধ জানান— লাইন-১ এর ভূগর্ভস্থ অংশ (CP-05), ডিপো (CP-02), লাইন-৫ (উত্তর) এর উড়াল অংশ (CP-03), লাইন-১ এর ভূগর্ভস্থ সেকশন (CP-04) এবং পরামর্শক সেবা চুক্তির সংশোধন।
রাষ্ট্রদূতের এই আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (DMTC Ltd.)-এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র জানায়, ডিএমটিসিএলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ-এর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অল্প কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির পরামর্শে, সিনিয়র অফিসারদের বাদ দিয়ে। তাদের অভিযোগ, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত তিনজন জেনারেল ম্যানেজার ও এক পরিচালককে কোনো যৌক্তিক মূল্যায়ন ছাড়াই ‘অদক্ষতা’ দেখিয়ে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগ আরও আছে, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয় কেবলমাত্র এই কারণে যে, তিনি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া কোনো বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তাছাড়া, তিনটি নির্মাণ প্যাকেজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক মাস ধরে কাজ শুরুর অপেক্ষায় থাকলেও ব্যবস্থাপনা ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল প্রক্রিয়া বিলম্ব করছে, এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। এমডি ফারুক আহমেদ প্রকল্প অফিস আগারগাঁও থেকে দিয়াবাড়ীতে স্থানান্তর ও পরামর্শক অফিসের জনবল ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থবিরতা তৈরি করছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) সূত্রে জানা যায়, জাইকার ঋণের অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহার না হলে ঋণ পুনর্গঠনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। জাপান ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ডলার (MRT-5) এবং ৫৪ কোটি ডলার (MRT-1) ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রকল্পের বিলম্বে জাপানি বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
MRT Line-1 (এয়ারপোর্ট–কমলাপুর–পূর্বাচল) হচ্ছে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল, যার দৈর্ঘ্য ৩১.৫৪ কিলোমিটার। বিমানবন্দর–কমলাপুর অংশ পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ, এবং এতে থাকবে ১২টি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন। অন্যদিকে, MRT Line-5 (উত্তর) প্রকল্পে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ হচ্ছে, যার মধ্যে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার হবে পাতাল অংশ। দুই প্রকল্প শেষ হলে দৈনিক প্রায় ৮ লাখ যাত্রী এই নেটওয়ার্কে যাতায়াত করতে পারবে।
রাষ্ট্রদূতের চিঠিতে ব্যবহৃত কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে স্পষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। “Faithful implementation” ও “expedited approval” শব্দদ্বয় বারবার ব্যবহার করে জাপান মূলত প্রশাসনিক বিলম্বের দায়ভার ইঙ্গিত করেছে বাংলাদেশের দিকেই। প্রকল্প দুটি বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ইতিহাসে মাইলফলক হতে পারত, কিন্তু নেতৃত্ব সংকট, নীতিগত শৈথিল্য ও প্রশাসনিক বিলম্ব একে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প শুধু অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়, এটি বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের প্রতীক। জাপান যেখানে “faithful implementation”-এর আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে ডিএমটিসিএলের অভ্যন্তরীণ সংকট প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। এখন সরকারের ওপর নির্ভর করছে—তারা কি এই প্রশাসনিক জটিলতা ও নেতৃত্বের অযোগ্যতা কাটিয়ে প্রকল্পকে এগিয়ে নেবে, নাকি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগর পরিবহন প্রকল্পটি ধীরগতির প্রশাসনিক গহ্বরে হারিয়ে যাবে।
