রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিলেও ফের ফিরে এলেন—সন্দ্বীপে মোস্তফা কামাল পাশার নমিনেশন বিতর্ক

গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন

9 Min Read
Highlights
  • মোস্তফা কামাল পাশা এমপি
  • বিএনপির নমিনেশন চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ)

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) সংসদীয় আসনে প্রবীণ বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল পাশা আবারও দলের নমিনেশন চেয়েছেন—এমন এক সময়ে যখন তিনি ২০১৮ নির্বাচনের পরে রাজনীতি ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই পুনরাবর্তন স্থানীয় রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে; সমর্থকরা তাকে পুনরুজ্জীবিত শক্তি হিসেবে দেখা শুরু করেছে, আর সমালোচকেরা তার অতীত আচরণ, সন্দ্বীপ উন্নয়নে অবদান, দলের দুঃসময়ে দলের প্রতি অনিশ্চিত আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

মোস্তফা কামাল পাশা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং দীর্ঘকাল সন্দ্বীপে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি পদে ছিলেন। তাতে— সত্ত্বেও স্থানীয় বিভিন্ন সুত্রে তাকে জাতীয়তাবাদী শক্তির দুঃসময়ে জিয়া পরিবারের সে-ই ক্রান্তিকালে সহযোগিতা না করার, দলের দুঃসময়ে দলের নেতা-কর্মীরা ঈদ কিংবা জাতীয় উৎসব গুলোতে ওনার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য গেলে ওনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা, সন্দ্বীপ উপজেলা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটি হওয়ার পর ওনার সাথে দেখা করতে গেলে ঐ ছাত্রদলের মৃত্যুঞ্জয়ী নেতা-কর্মীদের অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া সহ নানাবিধ অভিযোগ উঠেছে এই প্রবীণ নেতার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ ও বিতর্ক:

অভিযোগ উঠেছে, স্বৈরাচারের আমলে দলের কোনো নেতা-কর্মীর মামলার নূন্যতম সহায়তা তিনি করেননি। এমনকি আহত নেতাকর্মীদের পাশেও না দাঁড়ানোর মতো নেতিবাচক সমালোচনা আছে এই নেতার বিরুদ্ধে। ইনসাইড টিভির ডেডিকেটেড গবেষণা ও অনুসন্ধানী টিম জুলাই ছাত্র আন্দোলন চলাকারে তার সোস্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন আইডির কনটেন্ট এনালাইসিস করেছে। কোথাও এই প্রবীণ নেতার মাঠ ও অনলাইনে সংপৃক্ততার প্রমাণ পাইনি। পাইনি কোনো সোস্যাল মিডিয়া পোস্ট।

সাম্প্রতিক সময়ে সোস্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া তার একটি ভিডিও রাজনৈতিক পাড়ায় বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ঐ ভিডিওতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি সাবেক আহবায়ক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকারের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,

আপনার কাছে আমি বলেছিলাম যে আমি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমি আর রাজনীতি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।  এখন আমি আবার আসছি। আমি আবার রাজনীতিতে ঢুকেছি এলাকার লোকের চাপে। এখন আপনাকে বলতে আসছি। উপায় নেই, লোকেরা অনেক চাপ সৃষ্টি করছে।

ঐ একই ভিডিওয়ের অন্য আরেকটি ফুটেজে তিনি বলেন,

দল যদি আমাকে নমিনেশন দেয়, তাহলে দলের তরফ থেকে নির্বাচন করবো। না হয় স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করবো। এখানে দলের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা (বিএনপি) একটা সন্ত্রাসী দল।

জন্ম ও রাজনৈতিক জীবন:

মোস্তফা কামাল পাশা’র জন্ম ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা সন্দ্বীপ উপজেলা রহমতপুর ইউনিয়নে। পিতা: হাজী আব্দুল বাতেন সওদাগর ও মাতা: বিবি সখিনা বেগম। রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ করেন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির মধ্যদিয়ে। ১৯৭৩ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে সন্দ্বীপ রহমতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা চারবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৯০ সালে আওয়ামীলীগের হেভিওট প্রার্থীকে পরাজিত করে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি সরাসরি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে উঠে আসা নেতা নন। ১৯৯৩ সালে ন্যাপ মোজাফফর থেকে বিএনপিতে যোগ দেন মোস্তফা কামাল পাশা। তিনি বিভিন্ন সময়ে সন্দ্বীপ   (চট্টগ্রাম-৩ ও চট্টগ্রাম-১৬) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারির নির্বাচন) ও ২০০১ সালে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) ও ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-১৬ (সন্দ্বীপ) আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে সন্দ্বীপের নেতৃত্ব দেন।

অবদান ও রাজনৈতিক হামলা-মামলার স্বীকার:

সন্দ্বীপের এই জনপদকে বিএনপির অধ্যুষিত ঘাঁটি হিসেবে তৈরি করার পিছনে মোস্তফা কামাল পাশার অবদান অনস্বীকার্য। একমুখী শক্তিশালী নেতৃত্বের কারণে তিনি সন্দ্বীপের ইউনিয়ন ইউনিয়ন, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বিএনপি কিছু ত্যাগী নেতাকর্মী তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। এক সময় সন্ত্রাসীদের জনপথ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন সন্দ্বীপ উপজেলাকে সন্ত্রাস মুক্ত করতে সব চেষ্টা চালিয়ে যান। যদিও বিভিন্ন সময়ে তার ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তার অনুসারীদের কেউ কেউ নানান অপকর্মের সাথে  জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশ বিএনপির করুণ পরাজয়ের মুহূর্তে যে ২৮ জন প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন এই  মোস্তফা কামাল পাশা। ১/১১ সরকারের আমলে জরুরি আইনে গ্রেফতার হয়ে তিনি প্রায় ১ বছর কারা বরণ করেন। ২০১৩ সালের ২৪ নভেম্বর, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে তাঁর ছেলে গুলিবিদ্ধ হন এবং তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।

SWOT এনালাইসিস:

অনলাইন, অপলাইন ও মাঠ পর্যায়ে মোস্তফা কামাল পাশার দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংপৃক্ততার বিষয়ে SWOT এনালাইসিস করা হয়েছে। যেখানে.

Strengths (শক্তি): তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী কর্মী ও সমর্থক, একমুখী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, দুঃসময়ে বিএনপির আসন নিশ্চিত করা ও সফল জনপ্রতিনিধি সহ ইত্যাদি।

Weaknesses (দুর্বলতা): বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতা, ট্রেডেশনাল রাজনৈতিক মনোভাব, আধুনিক তারুণ্য নির্ভর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের অভাব, দলের দুঃসময়ে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা, দলের দুঃসময়ে দলের হাল না ধরা, এক অংশের নেতাকর্মীদের সাথে নেতিবাচক সম্পর্ক, সন্দ্বীপের মানুষের দীর্ঘ দিনের ভাগ্য পরিবর্তনে ব্যর্থ নেতৃত্ব, প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় রাজনীতিতে দুর্বল অবস্থান সহ ইত্যাদি।

Opportunities (সুযোগ): রাজনৈতিক পুনর্জীবন লাভের সুযোগ, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শূন্যতা পুরণের সম্ভাবনা, ও  দলের ভেতরে সঠিক কৌশল ও সুসম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার সহ ইত্যাদি।

Threats (হুমকি):  দলের অন্য শক্তিশালী নেতা ও নেতা-কর্মীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্থানীয় বিএনপির দ্বন্দ্ব-কোন্দল ও বিভাজন, বিপক্ষ রাজনৈতিক শিবির, তারুণ্য নির্ভর ভোটার, ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক মাঠ সহ ইত্যাদি।

SWOT এনালাইসিস পরবর্তীতে দেখা যায়, মোস্তফা কামাল পাশার শক্তি দিয়ে দুর্বলতা মোকাবিলা করার সক্ষমতা খুবই আশানুরূপ নয়। বিশেষ করে তার বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি তাকে প্রচন্ড পরিমাণ ভোগাবে। এই ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষিত তারুণ্য নির্ভর রাজনীতিতে তার সীমাবদ্ধতার বিষয়টির কারণে শক্তি গুলোকে অনেক বেশি আড়ালে নিয়ে যাবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুযোগের চেয়ে হুমকি অপেক্ষাকৃত বেশি। সে ক্ষেত্রে সুযোগ দিয়ে হুমকি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তাকে নানাবিধ রাজনৈতিক কুট-কৌশল ও পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে, যা তার অতীত নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে। সক্রিয় সংস্কার করলে পুনরুদ্ধার সম্ভাব্য; না হলে স্থানীয় ও দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হারার ঝুঁকি বেশি।

গত রবিবার (২৬ অক্টোবর), চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের মোট সাত মনোনয়ন প্রত্যাশীকে ঢাকাস্থ বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে ডাকা হয়। এর পর থেকে সন্দ্বীপ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নমিনেশন নিয়ে বিভিন্ন উৎকন্ঠা ও উদ্রেক দেখা দেয়। অন্যান্য নমিনেশন প্রত্যাশীদের পাশাপাশি সমালোচনা ও বিতর্ক শুরু এই এই প্রবীণ নেতার বিরুদ্ধে।

সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক কাউছার আহমেদ ইনসাইড টিভিকে বলেন,

যারা বিগত আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে ছিলেন না, রাজনীতি করবেন না বলেছেন, তাদেরকে এখন যদি নমিনেশন দেওয়ার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তৃণমূল কর্মীরা ভবিষ্যতে আন্দোলন সংগ্রামে না গিয়ে সুবিধা মত সময়ে দলের সুবিধাতে ভাগ বসাবে। এতে করে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

উপজেলার আরেক যুগ্ম-আহবায়ক ও সাবেক উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আজমত আলী বাহাদুর বলেন,

৫ আগষ্ট পূর্ববর্তী ১৭ বছর ফ্যাসিজম পতন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আওয়ামী দুঃশাসনের যারা জেল-জুলুম ও অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, বর্তমান ও আগামীর বাংলাদেশে তারা মূল্যায়িত হবে- এটাই তৃণমূলের প্রত্যাশা।

নমিনেশন ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চেয়ে মোস্তফা কামাল পাশার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তার পক্ষ হয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলমগীর হোসাইন ঠাকুর বলেন,

আমি কোনো বিতর্ক দেখছি না। এটা হচ্ছে বিরোধীতা করার জন্য বিরোধীতা। দলের কিছু লোক, কিছু নেতৃত্ব আছে যারা নগদ কিছু সুবিধায় অভ্যস্ত থাকে। কামাল পাশা সে সুবিধা দিতে পারছেন না। আমাদের কোনো কোনো নেতা আছেন যারা সে সুযোগ সুবিধা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছে ডাকেন।

ওনার বার্ধক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুর বলেন,

২০২১ সালের পর ওনি একটু অসুস্থ ছিলেন। সুস্থ হওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে ওনি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন।

মোস্তফা কামাল পাশার রাজনৈতিক জীবন একজোড়া বিদ্যমান বাস্তবতা—দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নির্বাচনী সাফল্য একদিকে; অপরদিকে দলীয় অনিশ্চয়তা, অভিযোগ, বিতর্ক আর সমালোচনার ছায়া। সন্দ্বীপবাসী ও বিএনপি নেতৃত্বের কাছে এখন প্রশ্ন হলো — পূর্বের নেতৃত্ব, দুঃসময়ে দলের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ, আধুনিক তারুণ্য নির্ভর রাজনৈতিক মনন, নৈতিকতা ও দলের প্রতি আনুগত্যকে কতখানি গুরুত্ব দেবে ভোট ও নমিনেশন নির্ধারণে।

লেখক: নজরুল বিপ্লব- সোস্যাল মিডিয়া স্পেশালিষ্ট ও সাংবাদিক, মাইন্স জার্মানি 

 

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *