মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান ত্রিমুখী সশস্ত্র সংঘর্ষ ও জান্তা বাহিনীর বিমান হামলার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাতেও। রোববার সকালে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকায় এক বাংলাদেশি শিশু আহত হয়েছে।
আহত শিশুটির নাম আফনান (১১)। সে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের মেয়ে। রোববার (১১ জানুয়ারি) সকাল ৯টার দিকে সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানকালে ওপার থেকে আসা একটি গুলি তার শরীরে লাগে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস দুপুর আড়াইটার দিকে জানান, শিশুটি গুলিবিদ্ধ হলেও মারা যায়নি। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। এর আগে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ করেন।
স্থানীয় পুলিশ সূত্র জানায়, ঘটনার পরপরই সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত কয়েক দিন ধরে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মংডু টাউনশিপ ও আশপাশের এলাকায় সরকারি জান্তা বাহিনী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থান লক্ষ্য করে টানা বিমান হামলা, ড্রোন হামলা ও মর্টারশেল নিক্ষেপ করছে। অপরদিকে স্থলভাগে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের অন্তত তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ চলছে।
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবী হোসেন বাহিনী। এই ত্রিমুখী সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত হোয়াইক্যং সীমান্তের বিপরীতে রাখাইনের বলিবাজার এলাকায় থেমে থেমে ব্যাপক গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের অন্তত ১১টি গ্রাম। আতঙ্কে অনেক মানুষ রাতভর জেগে থাকেন, কেউ কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নাফ নদী ও স্থলসীমান্ত দিয়ে ছোড়া গুলি এসে পড়ছে বসতঘর, চাষের জমি ও চিংড়িঘেরে। এতে সীমান্তবাসীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম জানান, সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা বলেন, টানা গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের কারণে সীমান্ত এলাকার মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। তিনি নিজেও বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি গুলি খুব কাছ দিয়ে পড়তে দেখেছেন, অল্পের জন্য রক্ষা পান।
এদিকে সম্প্রতি রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মো. আরমান জানান, সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র সংঘর্ষের পাশাপাশি জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সীমান্তবাসীদের সতর্ক থাকতে এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
