দেশের জ্বালানি খাতে প্রতিদিনই গ্যাসের মজুদ কমছে, কিন্তু বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়ছে না—এমন পরিস্থিতিকে বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে অংশ নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ম. তামিম জানান, সরকার জ্বালানি খাতের বকেয়া শোধ করতে সক্ষম হলেও ভর্তুকি কমাতে পারেনি, আর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস মজুদ ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে দৈনিক চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুটে, যা আগামীতে আরও বাড়বে।
তামিম বলেন, “২০৩৫ সালের জন্য পেট্রোবাংলা যে হিসাব দিয়েছে, তাতে নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা ধরা হয়নি। অথচ দেশের ৭০ শতাংশ জ্বালানি ব্যবস্থাই গ্যাসনির্ভর। এ অভাব অত্যন্ত শঙ্কাজনক।”
বিদ্যুৎ খাতে পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও সঞ্চালন সক্ষমতা ১৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট, যেখানে বাস্তবে সঞ্চালিত হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে ২৬ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। সঞ্চালন সক্ষমতা দ্রুত না বাড়ালে তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এজাজ হোসেন বলেন, “বর্তমানে প্রতি ঘনফুট গ্যাসের দাম ৩০ টাকা, কিন্তু এমন দিন আসতে পারে যখন ১০০ টাকা দিলেও গ্যাস পাওয়া যাবে না। পাইপলাইনগুলো ভঙ্গুর বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইচ্ছেমতো গ্যাস আমদানি করাও সম্ভব নয়।” তিনি অভিযোগ করেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অতিরিক্ত আরও দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, ফলে কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
এই সংকট শিল্প খাতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল জানান, “গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করছে। এর সঙ্গে ব্যাংকের উচ্চ সুদের চাপ মিলে শিল্প খাত ধসে পড়ার উপক্রম।”
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, “দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নীতিহীনভাবে পরিবর্তিত হয়। একটি স্থায়ী পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে ব্যবসায়ীরা সেই অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে।”
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা দ্রুত, সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন, যাতে শিল্প, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে।
