লাখো মানুষের ঢলে সম্পন্ন শহীদ ওসমান হাদির জানাজা, ইতিহাসের সাক্ষী মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ

ফরহাদ হোসেন, ঢাকা প্রতিনিধি

3 Min Read

লাখো মানুষের অশ্রু, স্লোগান আর নীরব প্রার্থনায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা পরিণত হয় এক ঐতিহাসিক শোকসভায়। শনিবার (২০ ডিসেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অংশ নেন দেশের সর্বস্তরের মানুষ।

দুপুরের আগেই দক্ষিণ প্লাজা ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। খামারবাড়ি থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত পুরো এলাকা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। কালো ব্যানার, মাথায় কাফনের কাপড়, হাতে শহীদের ছবি—সব মিলিয়ে এক আবেগঘন দৃশ্যের জন্ম দেয় এই জানাজা।

শহীদ হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক জানাজার নামাজ পড়ান। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। তবে কোনো পরিচয়ই এদিন বড় হয়ে ওঠেনি—সব পরিচয়কে ছাপিয়ে মানুষ এসেছিল একজন শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।

সকাল থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জড়ো হতে থাকেন ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণ মানুষের জন্য দক্ষিণ প্লাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়। আর্চওয়ে গেট দিয়ে প্রবেশ করতে করতে জনতার ঢল প্লাজা ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিড় সামাল দিতে প্রতিটি প্রবেশপথে নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করে। তবুও মানুষের স্রোত থামানো যায়নি—দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এই জানাজায় অংশ নিতে।

জানাজার আগে বেলা পৌনে ১১টার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে হাদির মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর মরদেহ নেয়া হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। গোসল ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুর ২টার দিকে মরদেহ আনা হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়।

পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শহীদ ওসমান হাদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে—যা অনেকের কাছে প্রতীকী ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করছে।

উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগ চলাকালে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলিবিদ্ধ হন হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। অস্ত্রোপচারের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৩ মিনিটে তার মরদেহ বহনকারী ফ্লাইট সিঙ্গাপুর ত্যাগ করে এবং সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছায়।

আজকের জানাজা শুধু বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না—এটি ছিল এক নীরব গণরায়। মানুষের কণ্ঠে, চোখে আর উপস্থিতিতে স্পষ্ট—শহীদ হাদি আর একজন ব্যক্তি নন, তিনি হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদের প্রতীক, সময়ের সাহসী স্মৃতি।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *