ওসমান হাদি হত্যাকান্ড: পরিকল্পনার নেপথ্যে কে?

মুসাইব ইব্রাহিম, ডেস্ক রিপোর্ট

3 Min Read

রাজধানীতে আলোচিত রাজনৈতিক কর্মী শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং এর পেছনে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ ওরফে ‘শাহীন চেয়ারম্যান’-এর নাম, যাকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদাতা ছিলেন শাহীন চেয়ারম্যান নিজেই। তিনি একা এই পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন না; তার সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন সাবেক নেতার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে কয়েকজন সন্দেহভাজনের গতিবিধির ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

শাহীন আহমেদ দীর্ঘদিন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি একজন প্রভাবশালী অপরাধী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন বলে দাবি এলাকাবাসীর। আগের সরকারের সময় প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকায় তার বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের নথিতে তিনি আগেই অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন।

গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান বলে তদন্তে জানা গেছে। প্রথমদিকে আত্মগোপনে থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এনক্রিপটেড অ্যাপ ব্যবহার করে তিনি দেশে থাকা সহযোগী ও তথাকথিত ‘স্লিপার সেল’-এর সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

হোয়াটসঅ্যাপ কল ও খুদেবার্তার সূত্র ধরে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে পলাতক এক ছাত্র সংগঠনের নেতার সঙ্গে হত্যাকারীদের যোগাযোগের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। ভারত থেকে অ্যাপভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকায় থাকা সহযোগীদের কাজ সমন্বয় করা হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, হামলার পর মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের দ্রুত গায়েব করে ফেলা হয় গুরুত্বপূর্ণ আলামত । বর্তমানে ফয়সাল ভারতের মহারাষ্ট্রে অবস্থান করছে বলে গোয়েন্দা তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঘটনার দিন গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলি করা হয় ওসমান হাদিকে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানো হয়, তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা এবং মাঠপর্যায়ের সহযোগীদের শনাক্ত করতে তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে। খুব শিগগিরই পুরো নেটওয়ার্কের চিত্র স্পষ্ট হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত অপরাধ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সীমান্ত পেরিয়ে অপরাধ পরিচালনার জটিল বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *