গত শুক্রবার এক পরিচিত সেলুনে বসে নাপিতের সঙ্গে গল্প করছিলাম। হঠাৎ সে এক অদ্ভুত কিন্তু গভীর চিন্তার বিষয় আমাকে শোনাল। বলল,
যদি ভগবান একটা কঠোর নিয়ম করতেন—যেখানে প্রতিটি পাপের জন্য নম্বর থাকত!
নাপিতের এই ভাবনা নিছক কৌতুক নয়, বরং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষের প্রতিধ্বনি। সে আরও বলল,
ন্যায়বিচার যিনি করবেন না, তাঁরও নম্বর যোগ হবে।
এই সরল কথার মধ্যেই আছে এক গভীর সত্য—মানুষ চায় দোষী শাস্তি পাক, নির্দোষ রক্ষা পাক, আর বিচারকও থাকুন সম্পূর্ণ নিষ্পক্ষ।
কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। ক্ষমতা, অর্থ আর প্রভাবের কাছে ন্যায়বিচার প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ ন্যায়ের আশায় অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তা
নাপিতের বলা “গায়ের রং বদলে যাওয়া” আসলে স্বচ্ছতার এক চমৎকার প্রতীক। আজকের সমাজে দুর্নীতিবাজ আর ভণ্ডেরা মুখোশ পরে সৎ মানুষের আলখেল্লা পরে ঘুরে বেড়ায়।
ভাবুন তো—যদি তাদের পাপ চোখের সামনে স্পষ্ট দেখা যেত, তাহলে কি তারা এত সহজে অপরাধ করত?
এই ভাবনা আমাদের শেখায়, সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। যেখানে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, যেখানে অপরাধ আড়াল করা সম্ভব নয়।
মানুষের মনস্তত্ত্বে ভয়ের প্রভাব
নাপিতের মতে, এমন ব্যবস্থায় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অপরাধ করতে ভয় পাবে। সত্যিই, ভয় অপরাধ দমনের এক শক্তিশালী অস্ত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু ভয় কি মানুষকে ভালো করে তুলতে পারে?
ভয় মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখে ঠিকই, কিন্তু একটি নৈতিক সমাজ গড়তে প্রয়োজন ভালোবাসা, শিক্ষা ও নৈতিকতার চর্চা। কেবল শাস্তি নয়, সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধই পারে মানুষকে প্রকৃত অর্থে সৎ করে তুলতে।
উত্তরণ: পরিবর্তনের পথ ও বাস্তবতার ডাক
নাপিতের কথায় এক ধরনের সরল আশাবাদ আছে। সে অন্তত পরিবর্তন চায়—একটা সমাজ যেখানে অন্যায়ের শাস্তি নিশ্চিত, আর সৎ মানুষ নিরাপদ।
তার এই ভাবনা মনে করিয়ে দেয়—মানুষের আস্থা ফিরে পেতে আমাদের প্রয়োজন সুশাসন, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, আর দৃঢ় নৈতিক শিক্ষা।
সময় নষ্টের আর অবকাশ নেই। যত দেরি হবে, অন্যায় ততই শিকড় গেড়ে বসবে, সমাজ ততটাই ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে।
নৈতিক সমাজের পথে
নাপিতের “সংখ্যার ন্যায়বিচার” হয়তো একেবারেই কাল্পনিক, কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক তীব্র বাস্তব বার্তা।
একটি সমাজ তখনই টিকে থাকতে পারে, যখন সেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমাদের প্রয়োজন এমন এক বাস্তবব্যবস্থা, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল কথার কথা নয়, বরং প্রতিটি মানুষের জীবনের নির্ভরযোগ্য সত্য।
যেখানে মাথা খসে পড়ে না, বরং মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে—ন্যায় ও নীতির আলোয়।
লেখক: ডিআইজি (এইচআর), পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা
