দুই দশক পর আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা। আগামী সোমবার (২৭ অক্টোবর) ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দুই দেশের নবম যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন (জিইসি) বৈঠক। দীর্ঘদিনের স্থবির দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আশায় এ বৈঠককে ঘিরে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল অর্থনৈতিক নয়—কূটনৈতিক সম্পর্কের উষ্ণতা ও পারস্পরিক আস্থার উন্নয়নও এ সহযোগিতার মূল চাবিকাঠি হবে।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, আর্থিক সেবা, ব্যাংকিং এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা—এমন বিভিন্ন খাতে আলোচনার মধ্য দিয়ে বৈঠকটি হবে উভয় দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের একটি প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, আর পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন দেশটির পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এর পরদিনই (২৮ অক্টোবর) বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন ইসলামাবাদ সফরে যাচ্ছেন, যেখানে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচিত হবে।
২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের রফতানি তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি অব্যাহত রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
পাকিস্তান যেসব পণ্য আমদানি করে, সেগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাংলাদেশে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি একটি মিউচ্যুয়াল রিকগনিশন এগ্রিমেন্ট করা গেলে কৃষি পণ্যের রফতানিতে অনেক বাধা দূর হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন,
বাংলাদেশের পণ্য পাকিস্তানের বাজারে কতটা প্রবেশ করছে এবং উভয় দেশ কতটা লাভবান হচ্ছে, তা দেখতে হবে। যদি পরিস্থিতি ‘উইন-উইন’ হয়, তবে অর্থনৈতিক কাঠামো আরও প্রসারিত হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোতেও সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
পাকিস্তানের সঙ্গে এখনও কিছু দেনাপাওনার ইস্যু রয়ে গেছে। সেগুলো নিষ্পত্তি না হলে বাণিজ্যিক অগ্রগতি ধীর হবে।
অন্যদিকে, ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন,
বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে সেই আস্থার পরিবেশ এখনো আসেনি। অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই রাজনৈতিক বিশ্বাস তৈরি করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-ইসলামাবাদ জিইসি বৈঠক বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন আঞ্চলিক সহযোগিতার সূচনা হতে পারে। তবে এই বৈঠকের সফলতা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের আন্তরিকতা, আস্থা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। দুই দশক পর শুরু হতে যাওয়া এই আলোচনা তাই শুধু একটি অর্থনৈতিক বৈঠক নয়—বরং দক্ষিণ এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশের নতুন আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার সম্ভাব্য সূচনা বিন্দু।
