রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকায় ভয়াবহ আগুন লাগা রাসায়নিক গুদামে প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর প্রবেশ করেছে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও গুদাম থেকে এখনো বের হচ্ছে ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস, যা এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বুধবার (১৫ অক্টোবর) বেলা ১১টার পর দুজন ফায়ার সার্ভিস সদস্য বিশেষ কেমিক্যাল সুট পরে গুদামের ভেতরে প্রবেশ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, গুদামে মজুত থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ একত্রে বিক্রিয়া করে বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস তৈরি হচ্ছে। এতে আশপাশের পরিবেশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। সকালে পাশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোর কর্মীরা কাজে ফিরলে ধোঁয়ার কারণে অনেকে শ্বাসকষ্ট ও বমিভাব অনুভব করেন।
এদিকে, নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও উৎসুক জনতার ভিড় থামছে না ঘটনাস্থলে। ফায়ার সার্ভিস বারবার সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বললেও অনেকে সতর্কতা মানছেন না।
ঘটনার একদিন পরেও নিখোঁজদের খোঁজে হাহাকার করছেন স্বজনরা। কেউ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় মরদেহের খোঁজে পাথর হয়ে বসে আছেন, কেউবা ভেঙে পড়েছেন অশ্রুতে। ঘটনাস্থল ঘিরে এখনো বিষণ্ণতা ও শোকের আবহ বিরাজ করছে।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, শিয়ালবাড়ির টিনশেড ভবনের ওই কেমিক্যাল গোডাউনে মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১২টার দিকে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ১২টি ইউনিট প্রায় সাত ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ১৬ জন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভবনটি তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকায় গার্মেন্টস কর্মীরা ভিতরে আটকা পড়ে প্রাণ হারান। গুদামে ছিল হাইড্রোজেন পার–অক্সাইড, ব্লিচিং পাউডারসহ অন্তত সাত থেকে আট ধরনের বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুনে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা বিষাক্ত গ্যাসে নয়, বরং আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে, বাকিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে।
একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
ভবনের অভ্যন্তরে রাসায়নিক পদার্থের ঘনত্ব এতটাই বেশি যে, স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান সতর্কতার সঙ্গে চলবে।
এই আগুন শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং রাজধানীতে অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীন রাসায়নিক গুদামগুলোর ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। নগর পরিকল্পনাবিদ ও অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল স্টোরেজের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও বহু গুদাম গড়ে উঠেছে প্রশাসনিক উদাসীনতায়।
তারা মনে করেন, এই ঘটনা যদি যথাযথ তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপে পরিণত হয়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা ও নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
