ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে শুটার ফয়সালের বোনের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল অঙ্কের ব্যাংক চেক। ১১টি ব্যাংকের মোট ৩৮টি চেক, যার মধ্যে ৩২টি উত্তোলনযোগ্য—মূল্যমান প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। অথচ এসব চেকের বিপরীতে থাকা হিসাবগুলোর অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে অচল, খুঁজতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই মিলছে না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওসমান হাদিকে গুলি করার পরদিন ফয়সাল তার মাকে নিয়ে আগারগাঁওয়ের বাসার পাশের একটি পরিত্যক্ত স্থানে কিছু খুঁজছিলেন—সিসিটিভি ফুটেজে এমন দৃশ্য ধরা পড়ে। পরে ওই স্থান থেকেই উদ্ধার হয় হত্যায় ব্যবহৃত গুলির মতো একই ধরনের গুলি। একই বাসা থেকেই মেলে কোটি কোটি টাকার চেক, যা তদন্তকারীদের নজর কাড়ে।
ব্যাংক সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রিমিয়ার, প্রাইম, ন্যাশনাল, আল আরাফাহসহ বিভিন্ন ব্যাংকের শাখায় ইস্যু করা চেকগুলোর বিপরীতে থাকা হিসাবগুলোতে উল্লেখযোগ্য কোনো লেনদেন নেই। কোথাও হিসাব ডরমেন্ট, কোথাও বহুদিন আগে কার্যক্রম বন্ধ। সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর কর্মকর্তারাও এসব অঙ্কের চেক সম্পর্কে কোনো কার্যকর তথ্য দিতে পারেননি।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—যে সাতটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৭২ কোটি টাকার চেক ইস্যু হয়েছে, সেগুলোর ঘোষিত ঠিকানায় গিয়ে কোনো অফিস, সাইনবোর্ড বা কার্যক্রমের অস্তিত্ব মেলেনি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধনের প্রমাণ থাকলেও বাস্তবে তারা কার্যত অদৃশ্য। ফোন নম্বরগুলোও বন্ধ বা অকার্যকর।
এ ছাড়া ছয়জন ব্যক্তির নামে ইস্যু করা প্রায় ৪৬ কোটি টাকার চেকও তদন্তের আওতায় এসেছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা উত্তোলনের কোনো সক্ষমতা নেই—যা মানিলন্ডারিং, ভুয়া লেনদেন বা ‘কভার স্টোরি’ তৈরির সন্দেহকে আরও জোরালো করছে।
সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, এসব চেক কারা, কী উদ্দেশ্যে এবং কোন প্রেক্ষাপটে ইস্যু করেছে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের প্রশ্ন, হাদি হত্যা কি একমাত্র লক্ষ্য ছিল, নাকি এই হত্যাকাণ্ডের আড়ালে আরও বড় কোনো আর্থিক বা রাজনৈতিক ‘মিশন’ লুকিয়ে আছে?
উল্লেখ্য, ওসমান হাদি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যেই তাকে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার রহস্যময় চেক, অচল ব্যাংক হিসাব এবং অদৃশ্য প্রতিষ্ঠান—যা মামলাটিকে নিছক একটি হত্যাকাণ্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে বড় পরিসরের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হবে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ।
