উত্তাল জুলাই থেকে সফল গণঅভ্যুত্থান: শেখ হাসিনার পতনের দিনগুলো

মুসাইব ইব্রাহিম, ডেস্ক রিপোর্ট

4 Min Read

উত্তাল জুলাই। উত্তাল পুরো বাংলাদেশ। এরপর এলো আগস্ট, দেশ যেন আরও অগ্নিগর্ভ। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা আগস্টের প্রথম দিনকে ১ আগস্ট বলতে চাইলেন না। বরং তারা একে বললেন ২০২৪ সালের ৩২ জুলাই। তারপর গণনা চলতে থাকে— ৩৩ জুলাই, ৩৪ জুলাই, ৩৫ জুলাই…। উত্তাপ বাড়তে থাকে প্রতিদিন।

রাজধানীসহ দেশের শহরে শহরে গুলি করে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। হামলা-পাল্টা হামলা চলছে। স্থাপনায় আগুন, সর্বত্র আতঙ্ক। কিন্তু কেউ পিছু হটছে না। পক্ষ-বিপক্ষ সবাই এ লড়াইকে চূড়ান্ত হিসেবে নিয়েছে। হার মানলে ‘ডিসকোয়ালিফাইড’।

দেশের আপামর ছাত্র-জনতা ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মিশনে নেমেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে সরকারও আন্দোলনকারীদের রুখতে মরিয়া। প্রয়োজনে আরও হত্যা। কিন্তু রাজপথ ছাড়ার প্রশ্নই ওঠেনি। যেন এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধক্ষেত্র।

এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেন—
“গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিটা যায় না। এইটাই হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।”

আন্দোলনের শুরু

পহেলা জুলাই শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলন। ১৬ জুলাই এক ভয়ঙ্কর বাঁক নেয় এই আন্দোলন। পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।

একই দিনে চট্টগ্রামে ছাত্রদলকর্মী ওয়াসিম আকরাম গুলিতে মারা যান। সেদিন সারা দেশে মোট ৬ জন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন আর কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশের সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজপথে।

এরপর শুরু হয় রক্তাক্ত সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, হামলা ও পাল্টা হামলা। প্রতিদিন লাশ পড়ছে, কিন্তু জনতা আর পিছু হটছে না।

চূড়ান্ত ডাক: ‘লং মার্চ টু ঢাকা’

৩৫ জুলাই (৪ আগস্ট) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষণা দেয়— ৬ আগস্ট ঢাকামুখী লং মার্চ। পরে সিদ্ধান্ত বদলে ঘোষণা করা হয়, ৫ আগস্টেই (৩৬ জুলাই) রাজধানীমুখী লং মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই— গণভবন ঘেরাও।

ঘোষণার পরপরই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। রাজধানীর দিকে ছুটে আসতে থাকে মিছিলের পর মিছিল।

গণভবন ঘিরে লৌহকপাট নিরাপত্তা

৪ আগস্ট সকাল থেকে গণভবন ও এর আশপাশের এলাকায় ট্যাংক, এপিসি, সাঁজোয়া যানসহ সেনা-পুলিশ-বিজিবি মোতায়েন হয়। ম্যাজিস্ট্রেটসহ সেনাবাহিনী কড়া নজরদারিতে রাখে চারদিক। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ব্যারিকেড বসানো হয়।

সেই রাতের ঢাকা ছিল এক ভুতুড়ে নগরী— নির্জন, নিস্তব্ধ, আতঙ্কে মোড়া। পল্টন থেকে মহাখালী পর্যন্ত রাস্তায় কোনো মানুষ দেখা যায়নি। কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল।

গণভবন রাতে গণভবনের ভেতরে টানা বৈঠক চলে। সরকারের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট ছিল—

যেকোনো মূল্যে আন্দোলন দমন।

কিন্তু সেনাবাহিনী জানিয়ে দেয়—
তারা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাবে না।

হাসপাতালের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনার ভিডিও বৈঠকে উপস্থাপন করা হলে প্রমাণ হয়, এসব তাণ্ডব চালিয়েছে সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা, জঙ্গি বা আন্দোলনকারীরা নয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হয়ে পড়ে পুলিশও। গোলাবারুদ শেষ, বাহিনী ক্লান্ত। এক পর্যায়ে তিন বাহিনীর প্রধান শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেন।

শেখ হাসিনার পলায়ন

৫ আগস্ট ভোরে চূড়ান্ত নাটকীয়তা শুরু হয়। সেনাবাহিনী প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করে। শেখ রেহানা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের হস্তক্ষেপে অবশেষে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন।

সকাল সাড়ে ১০টা থেকে রাজধানীর শাহবাগ ভরে ওঠে লাখো মানুষে। দুপুরে আন্দোলনকারীরা গণভবনের দিকে অগ্রসর হয়। সেনাবাহিনী বাধা দেয়নি, বরং সুশৃঙ্খলভাবে প্রবেশে সহায়তা করে।

গণভবনে প্রবেশের মাত্র ৩০ মিনিট আগে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন।

শেখ হাসিনার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সারা দেশে বাঁধভাঙা উল্লাস।
শাহবাগ থেকে গণভবন অভিমুখে মানুষের স্রোত বইতে থাকে।

লাখো মানুষ গণভবনে প্রবেশ করে, ভাঙচুর-ক্ষোভ ঝাড়ে ১৫ বছরের জমে থাকা দুঃখে। গণভবনের পুকুরে নেমে ধুয়ে মুছে ফেলে গ্লানি আর দুঃখের ইতিহাস।

এভাবেই শেষ হয় ৩৬ দিনের অভাবনীয় আন্দোলন, জন্ম নেয় বাংলাদেশের এক সফল গণঅভ্যুত্থান।

 

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *