ঠাকুরের ইশারায় বিএনপির নামে গুপ্তছড়া ঘাটের চাঁদাবাজির অর্ধ কোটি টাকা ভাগাভাগি (১ম-৪র্থ পর্ব )

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিশেষ ইনসাইড

27 Min Read
Highlights
  • গুপ্তছড়া ঘাটের অর্ধকোটি টাকা চাঁদাবাজি ও আত্মসাৎ
  • নেপথ্যে উপজেলা ছাত্রদল সদস্য সচিব শহিদুল শহিদ ও তার গুরু ঠাকুর
  • কেওড়া বনে জুয়ার আসর
  • চাঁদাবাজির টাকায় উপজেলা পার্টি অফিসের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ
  • উপজেলা বিএনপির টোটালি মা-বাপ তারা
  • কি দিয়া সুবিধা নিলা? দলটা বিক্রি কইরা?
  • একটা সাগর চুরি করে ফেলছে চার মাসে
  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অব সন্দ্বীপ (মামুন চেয়ারম্যান )
  • রাতের আধাঁরে মালের বোট ডাকাতি
  • আমাকে কি ঠাকুর ও মামুন চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করতে হয় নাই

প্রথম পর্ব (২২ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত)

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগে গুপ্তছড়া ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে শুরু হয় নতুন সমীকরণ। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, আর্থিক হিসাব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং একাধিক বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণে ঘাট পরিচালনাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪৬ লাখ ৫১ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপজেলা ছাত্রদল সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম শহিদ, তার গুরু ঠাকুর ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুরো দেশ যেখানে চরম সংকটে ঠিক সে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া ঘাট দখল করে উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নাম ভাঙিয়ে একটি মহল। মূলত পটপরিবর্তনের পর উপজেলা বিএনপি পক্ষ থেকে ইঞ্জি. বেলায়েত হোসেনের (বর্তমান সিডিএ চেয়ারম্যান) নিয়ন্ত্রণে ঘাট পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেও, ৬ই আগষ্ট সকাল থেকে শহিদের নেতৃত্বে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের প্রায় ৫০-৬০ জন কর্মী গুপ্তছড়া ঘাটে অবস্থান নেন। তৎকালীন ঘাট ইজারা ব্যবসার অন্যতম অংশীদার আওয়ামীলীগ নেতা আনোয়ার চেয়ারম্যানের শালা মোঃ সোহরাব হোসেনকে দায়িত্বে রেখে হরিলুটের খেলায় মেতে উঠে উপজেলা ছাত্রদল সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম শহিদ ও তার অনুসারীরা। ৬ আগষ্ট থেকে পরবর্তী ৪৩ দিনে শহিদের নেতৃত্বে সোহরাবের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা করে ৫০-৬০ জন নেতাকর্মীর নাম দেখিয়ে তথাকথিত ‘সম্মানি’ (চাঁদার উন্নত সংস্করণ) বিতরণ করা হয়। জনপ্রতি নেতাকর্মীর অবস্থান বিবেচনায় ৫০০, ৬০০ ও ১০০০ টাকা প্রদান করা হয়। পুরো সময়ে এই খাতে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এই সকল নেতাকর্মীদের প্রায় সবাই ছিল মগধরা ও ঘাটের আশে পাশে শহিদ ও উপজেলা বিএনপি সদস্য সচিব আলমগীর ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ জন।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সোহরাবের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় মতবিরোধ ও সুবিধা করতে না পেরে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন শহিদ ও তার অনুসারীরা। ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত কাউন্টার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন শহিদের ঘনিষ্ঠ আমিন রসুল। এই সময় শহিদ ও তার অনুসারীরা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সম্মানি দেওয়ার নামে আত্মসাৎ করে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, সেপ্টেম্বরের শেষ ১৫ দিন ৩ লক্ষ ৬৩ হাজার, অক্টোবরে ৪ লক্ষ ৫৬ হাজার এবং নভেম্বরে ৪ লক্ষ ২৭ হাজার টাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ এমাউন্ট, যা হোটেল জামানের বৈঠকে (বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত পরবর্তী পর্বে থাকছে) শহিদ ও জগলুল নয়নের (আরেক অংশীদার) উভয় পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়।

এই সম্মানির বাহিরে ‘কাউন্টার খরচ’ নামে একটি জটিল হিসাবের সন্ধান পেয়েছে অনুসন্ধান টিম। জগলুল নয়নের বৈঠকে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘কাউন্টার খরচ’ দেখানো হতো যা সম্মানি, স্টাফ বেতন, চা-নাস্তার ও আনুষাঙ্গিক খরচের বাহিরে। এই কাউন্টার খরচের উল্লেখযোগ্য ব্যয় খাত ছিল, পার্টির বিভিন্ন উৎসবে কেক কাটা, পার্টির অনুষ্ঠান, পার্টির মিছিল মিটিং এবং নেতাকর্মীদের দুপুরের খাবার সহ আপ্যায়ন বিল। উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকে নিদিষ্ট অংকের সম্মানি (চাঁদা) এই খাত থেকে দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে দাবি করে শহিদপক্ষ।

চাঁদা সম্মানির পাশাপাশি আরেক প্রকার সম্মানির বিষয়ও আবিষ্কার করেছে অনুসন্ধান টিম। সেটা হচ্ছে চাকরির ‘বেতন সম্মানি’। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর শহিদের উদ্যোগে এবং জগলুল নয়নের সম্মতিতে সাতজনকে মাসিক ১৫ হাজার টাকা করে সম্মানিভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা হলেন—শহিদ, গোপরান, আলাউদ্দিন, ওসমান, আবদুল হামিদ, এরশাদ ও লিটন। এদের প্রত্যেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সাথে যুক্ত।

সূত্র জানায়, শুরুতে প্রত্যেকে ৩০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে মাসিক ১৫ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। প্রতি মাসে এই খাতে ব্যয় দেখানো হয় ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। তাদের দায়িত্ব ছিল ঘাটে কোনো বাধা সৃষ্টি না হতে দেওয়া এবং সার্বিক তদারকি করা।

পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ঘাটে প্রতিদিন সম্মানি পাওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। সংখ্যা কমার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল উপস্থিত নেতাকর্মীর চেয়ে সংখ্যায় কম হওয়া, যা সম্মানির টাকা আত্মসাৎ করার জন্য অতিরিক্ত দেখানো হতো। বিশেষ করে জগলুল নয়নদের তদারকি ও আপত্তির মুখে এই সংখ্যা পর্যায়ক্রমে হ্রাস পায়। পরে ঘাটের নিরাপত্তা ও তদারকির দায়িত্বে সাতজনকে মাসিক সম্মানিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে ইজারাদার পক্ষ প্রশ্ন তোলে—যখন নির্দিষ্ট দায়িত্বে সাতজনকে নিয়মিত সম্মানি দেওয়া হচ্ছে, তখন অতিরিক্ত ব্যক্তিদের কেন প্রতিদিন আলাদাভাবে সম্মানি দেওয়া হবে?

এই সিদ্ধান্তের পরদিনই দৈনিক ভিত্তিতে সম্মানি পাওয়া প্রায় ২০ জনকে এককালীন মোট ৯৫ হাজার টাকা পরিশোধ করে তাৎক্ষণিক তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এবার সব ঠিক হয়ে যাবে মনে করলে ভুল হবে। সমস্যা তৈরি হয় শহিদের ঘনিষ্ঠ অনুসারী আমিন রসুলকে (মগধরা ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি) নিয়ে। কাউন্টার খরচ আর আমিন রসুল যেনো একই সূত্রে গাঁথা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কতৃপক্ষের হিসাবের বাহিরেও শহিদ আমিন রসুলের মাধ্যমে কাউন্টার থেকে টাকা সরিয়েছে। কোনো কোনো সময় কতৃপক্ষ অবগত থাকলেও বেশি ভাগ সময় গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টাকা চলে যেতো উপরে। এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘাটের এক কর্মচারী বলেন,

মূলত আমিন রসুল ছিল শহিদের বিশ্বস্ত এজেন্ট। টিকিট বিক্রিতে অনেক ভাবে টাকা সরানোর সুযোগ থাকে। যতটুকু আমরা ধরতে পারতাম তার হিসাব রাখা হতো। বাস্তবিক অর্থে শহিদ আমিন রসুলের মাধ্যমে গোপনে অনেক টাকা সরিয়েছে, যার কোনো হিসাব নেই।

প্রতিদিন অস্বাভাবিক ‘কাউন্টার খরচ’ সম্পর্কে আমিন রসুলের কাছে কতৃপক্ষ জগলুল নয়ন জানতে চাইলে সে উত্তরে বলতো,

ঘাট চালাতে হলে এরকম খরচ দিতে হবে। কিছু করার নেই।

আমিন রসুলের কর্মকাণ্ডে অসহায় ও বিরক্ত হয়ে জগলুল নয়ন একাধিকবার তাকে কাউন্টার থেকে সরানোর জন্য শহিদকে অনুরোধ করেন। প্রত্যেকবার শহিদ পাশ কাটিয়ে গেলেও পরে ১ ডিসেম্বরের ঘাট পরিচালনা সংক্রান্ত মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ডিসেম্বরের শেষের দিকে ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাবেক ছাত্রদল নেতা আনিস আক্তার টিটু সহ অন্যরা।

দ্বিতীয় পর্ব (২৮ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত)

স্পিডবোটের পাশাপাশি ঘাটে চলাচলকারী ২৪টি ভ্যান থেকেও প্রতিদিন ভ্যানপ্রতি ২০০ টাকা করে মোট ৪ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করা হতো বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চালক আবুল কালাম দিন শেষে আদায়কৃত অর্থ শহিদের আত্মীয়  আলাউদ্দিন সওদাগরের চায়ের দোকানে জমা দিতেন। এভাবে প্রায় ৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা জমা হয়। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকা বিএনপির উপজেলা পার্টি অফিসের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে ব্যয় করা হলেও বাকি টাকা চলে যায় শহিদ ও তার নেতাদের পকেটে।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবু তাহের গুপ্তচরা ঘাটে ব্রীজের উপর বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। একই বিষয়ে অনুসন্ধান টিম বিএনপি নেতা ইঞ্জি. বেলায়েত হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনিও এই বিষয়ে অবগত বলে স্পষ্ট করেছেন। তবে হোটেল জামানের বৈঠকে শহিদপক্ষের দাবি, এই অর্থ থেকে ১ লক্ষ টাকা ঘাটে নৌবাহিনীর হাতে আহত নেতাকর্মীদের (যারা ঘাটের দায়িত্বে ছিলো) চিকিৎসায় ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে, যার মধ্যে হোটেল জামানের বৈঠকের আগ পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকা খরচ করা হয়। তবে জগলুল হোসাইন নয়নের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আহত কর্মীদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় ঘাট ইজারাদার কতৃপক্ষ বহন করেছেন।

বৈঠকে শহিদ আরো স্পষ্ট করেন, ঐ টাকা থেকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা ঘাটের আশেপাশের নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীকে দিয়েছেন। তবে, এর বাহিরে অবশিষ্ট টাকার সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি শহিদপক্ষ। এই বিষয়ে বৈঠকে আহ্বায়ক এড. আবু তাহের দাবি করেন, ভ্যান গাড়ি থেকে আয় করা টাকার তেমন কোনো খরচের খাত ছিলো না। কিন্তু, বৈঠকের আগে  এড. আবু তাহেরের প্রশ্নের মুখে শহিদ এই খাত থেকে জন প্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা করে ৭ জনের সম্মানি দিয়েছেন বলে দাবি করেন। শহিদের দাবি মিথ্যা তখনি প্রমাণিত হয়েছে যখন বৈঠকে এড. আবু তাহেরকে ৭ জনের সম্মানি নিজেদের ব্যয় খাত থেকে দিয়েছেন বলে জগলুল নয়ন স্পষ্ট করেন। কারণ, ভ্যান গাড়ির সাথে ঘাট ইজারাদারের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। এই টাকা পূর্বে আনোয়ার চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে ছিলো, পরে হাত বদল হয়ে যায় শহিদের কাছে।

এর বাহিরে বৈঠকে এড. আবু তাহের তার জানা মতে (বিভিন্ন জনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে) কাঠের বোট, বলগেট, ও গোদী ভাড়া সহ অন্যান্য হিসাব বাবদ আরো প্রায় ১৫ লক্ষের বেশি টাকার হিসাব দাবি করেন। বৈঠকে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য অনুসারে, ঘাটে প্রতিদিন প্রায় ৫-১০ টা বলগেট ঢুকতো। ঐ সময়ে প্রায় ১০০ বলগেট ঢুকার দাবি করা হয়। প্রতি বলগেটের গোদী ভাড়া নেওয়া হতো ৩ হাজার ৫০০ টাকা। বৈঠকে আবদুল ওহাব কবির নামে এক যুগ্ম-আহ্বায়ক দাবি করেন তাদের ৩ টি বলগেট থেকে সাড়ে ১০ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এই হিসেবে ১০০ বলগেট থেকে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা আদায় হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট জোর দেন আবদুল ওহাব কবির।

সাধারণত নৌকার মালিকরা ঘাট, নদী বা খালের তীরে বা পানিতে নির্দিষ্ট স্থানে নৌকা বেঁধে রাখা বা নোঙর করার জন্য জমির মালিক, ঘাট ইজারাদার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যে ভাড়া বা ফি প্রদান করেন, সেটা হচ্ছে গোদী ভাড়া। যতবার বলগেট বা বোট খালের ভিতর ঢুকবে ততবার এই ভাড়া দিতে হয়। দরুন, কোনো বলগেট ঘাট থেকে ছেড়ে গিয়ে খালের মুখ পর্যন্ত গিয়েছে, বৈয়রী আবহাওয়াতে খালের মুখ থেলে আবার ফেরত এসেছে, তখনও ঐ বলগেটের জন্য পুনরায় গোদী ভাড়া দিতে হবে।

ঘাট উন্মুক্ত হওয়া বা ইজারা প্রথা বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত ইজাদার কতৃপক্ষ এই টাকা আদায় করতো। সে হিসেবে জগলুল নয়ন শহিদকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে শহিদ নেতাদের বলগেট বলে চালিয়ে দিতেন। সে যুক্তি দিতো এই বলগেট গুলো মধ্যে আনিস আক্তারের ২৫ টি ও মসি সহ অন্যান্যদের বেশ কয়েকটি ছিলো, যারা বিএনপির নেতা হওয়ার কারণে কেউ গোদী ভাড়া দিতো না। তবে জগলুল নয়নের চাপে মুখে সে একবার এই ভাড়া বাবদ ১০ হাজার টাকা জগলুল নয়নকে প্রদান করেন। পরবর্তীকে এই ভাড়া সংগ্রহের জন্য শহিদ হেলাল নামে এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেন। সর্বশেষ তথ্য মতে শহিদ ও হেলাল কেউ আর জগলুল নয়নকে গোদী ভাড়া দেননি।

বৈঠকে কাঠের বোট ভাড়ার বিষয়েও স্পষ্ট আরগিউম্যান্ট করা হয়। বৈঠকে আলোচকেরা দাবি করেন, আবু তাহের কন্টাক্টর নামে এক ব্যক্তিকে তার ১৮টি কাঠের বোটের জন্য ৬০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে। এই উদাহরণ টানলে বাকি বোট গুলোর কোনো সুস্পষ্ট হিসাব নেই এবং এই হিসাব খাত থেকে শহিদ ও তার অনুসারীরা কত লক্ষ টাকা লুট ও আত্মসাৎ করেছে তা কল্পনারও বাহিরে।

শহিদ কাণ্ডের এখনো ইতি টানার সময় হয়নি। এরপর জুয়া আসর কাণ্ড। এই কাণ্ড সম্পর্কে অল্প কিছু বাক্য ব্যয় করে আজকের পর্ব শেষ করবো। মাস খানেক আগে গুপ্তছড়া ঘাটে কেওড়া বা কেরবা বাগানের ভিতরে শহীদের নেতৃত্বে একটি জুয়ার আসর বসানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথম দিনেই প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়, যার মধ্যে ২০ হাজার টাকা শহীদ নিয়ে নেন বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন মনির। তবে রাজনৈতিক চাপে ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে জুয়ার আসর বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

তৃতীয় পর্ব (৩০ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত)

চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আদায়কৃত অর্থ প্রথমদিকে শহিদ, আমিন রসুল এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই টাকার গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ জানাজানি হলে সন্দ্বীপ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নীরব ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েন। অভিযোগের টাকার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও, কয়েকজন নির্দিষ্ট নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো দলের বদনাম হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে দলীয় অনেকেই সরব হতে শুরু করেন।

বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় প্রকাশ্যে একাধিক বৈঠক ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উপজেলা বিএনপির পার্টি অফিসে অনুষ্ঠিত একটি রুদ্ধশ্বাস বৈঠক। ওই বৈঠকে উপজেলা বিএনপির কমিটির সকল সদস্য, প্রতিটি ইউনিয়ন বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে কয়েকজন যুগ্ম আহ্বায়ক অভিযোগগুলোর বিষয়ে কড়া অবস্থান নেন। আলোচনার একপর্যায়ে ঘাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জগলুল হোসাইন নয়নকে উপস্থিত সবার সামনে ফোন করা হলে তিনি নিজের অবস্থান ও অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন বলে বৈঠকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

এরপর উপজেলা বিএনপির নেতাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আরও তৎপরতা দেখা দেয়। জগলুল নয়নের পক্ষ থেকেও উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দকে পুনরায় অভিযোগ ও বিভিন্ন তথ্য জানানো হলে চট্টগ্রামের অলংকার মোড়ের হোটেল জামানে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটব্যাপী একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় শুক্রবার, জুমার নামাজের ঠিক আগ মুহূর্তে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক দুই যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাউদ্দিন ও ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন (বর্তমান সিডিএ চেয়ারম্যান), উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এড. আবু তাহের, সদস্য সচিব আলমগীর ঠাকুর এবং যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাসেম মাস্টার (চট্টগ্রাম-৩ আসনের এমপির ব্যক্তিগত সহকারী), আবদুল ওহাব কবির, গাজী হানিফ, জাহাঙ্গীর হোসেন ও কাউছার আহমেদ। এছাড়া ঘাট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি জগলুল নয়ন ও তার ম্যানেজার, সোহরাব হোসেন, শহিদুল শহিদ, আমিন রসুলসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও আলোচকেরা বিএনপির নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বৈঠকের পুরো সময়ের একটি গোপন ভিডিও ইনসাইড টিভি অনুসন্ধান টিমের হাতে এসেছে। ওই ভিডিওতে জগলুল নয়নের ম্যানেজার, সোহরাব এবং শহিদ নিজ নিজ পক্ষ থেকে বিভিন্ন হিসাব তুলে ধরেন, যা গত দুই পর্বে অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকাশ করা হয়েছে। বৈঠকের শেষ দিকে অ্যাডভোকেট আবু তাহের পুরো হিসাবের একটি খসড়া প্রস্তুত করেন।

বৈঠকে উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বের সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। উপস্থিত অনেকেই এড. আবু তাহের ও আলমগীর ঠাকুরের নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। আলোচনায় উঠে আসে, স্বল্প সময়ের জন্য গঠিত আহ্বায়ক কমিটি বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করলেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রত্যাশিত সফলতা দেখাতে পারেনি। কমিটির বিভিন্ন ব্যর্থতার বিষয়েও বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী হানিফ বলেন,

সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির যে আহ্বায়ক কমিটি আছে, ওইটা কোনো বিএনপি নয়। উপজেলা বিএনপির টোটালি মা-বাপ তারা।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত বিষয়ে পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। তবে উপস্থিত আলোচক বা বক্তাদের বেশ কয়েকটি উক্তি নিম্নে তুলে ধরা হলো..

বিশ্বাস করেন সালাউদ্দিন ভাই। গোপনে এই বিষয়ে (ঘাটে চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাৎ) আমি অনেক তদন্ত করেছি। এই বিষয়ে আমার জানা আছে। – আবুল কাসেম মাষ্টার

একজন মানুষ সব দিকে বেনিফিশারি হতে পারে না। তোমরা বলগেট, ভ্যান গাড়ি, গোদী ভাড়া কোন খাত থেকে কত টাকা নিয়েছো, কত টাকা খরচ হয়েছে তার একটা হিসাব দাও। না হয় আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবো। দল যেখানে বিতর্কিত হবে, আমার মনে হয় এই বিষয় গুলো দপ্তরে কেউ পাঠালে আমাদের বহিষ্কার করে দিবে। সর্ব প্রথম আমি, তাহের সাহেব ও আলমগীর ঠাকুর বহিষ্কার হবোই হবোই। তোমরা অনিয়ম করছো। এখন তো দেখতেছি ঘটনা সত্য। সাংবাদিকেরা আমাদের যে প্রশ্ন করে আসলে তারা ঠিক। -ইঞ্জি. বেলায়েত হোসেন

সুবিধা ঠিকাছে। স্বাভাবিক ভাবে তোমরা যারা জড়িত ছিলা তারা সুবিধা নিয়ছো। কি দিয়া সুবিধা নিয়েছো? দলটা বিক্রি কইরা?- কাজী সালাউদ্দিন

একটা সাগর চুরি করে ফেলছে চার মাসে। আওয়ামীলীগের আমলে যা হয় নাই, তার চেয়ে বেশি লুটপাট করেছে বিএনপির নামধারী কিছু লোকজন। আরো ১০০ গুণ বেশি করছে।- জাহাঙ্গীর হোসেন

অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী এই বিষয় গুলো অর্থনীতির দুটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা—Cost-Push Theory এবং Cost Pass-Through—এ ধরনের ঘটনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যাখ্যা করতে সহায়ক।

Cost-Push Theory অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেই অতিরিক্ত ব্যয় কোনো না কোনোভাবে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়। ঘাট পরিচালনার ক্ষেত্রে জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের পাশাপাশি যদি অভিযোগ অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও পরিচালন ব্যয়ের অংশে পরিণত হয়। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লোকসান এড়াতে ভাড়া বৃদ্ধি, ব্যয় সংকোচন অথবা সেবার মান কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

অন্যদিকে Cost Pass-Through ধারণা বলছে, কোনো ব্যবসার অতিরিক্ত ব্যয় সব সময় মালিক নিজে বহন করেন না। বাজারের অবস্থা, প্রতিযোগিতা, যাত্রী চাহিদা এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সেই ব্যয়ের একটি অংশ বা পুরোটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর স্থানান্তরিত হতে পারে। অর্থাৎ, অভিযোগ অনুযায়ী যদি ইজারাদার বা নৌ-যান মালিকদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়ে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব যাত্রীভাড়া, পরিবহন ব্যয় কিংবা সেবার মানের ওপর পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ ব্যয়কে অনেক সময় “Informal Cost” বা “Informal Tax” হিসেবেও বিশ্লেষণ করা হয়। কারণ, এটি ব্যবসার উৎপাদন বা সেবা প্রদানের প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রী, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ভবিষ্যতে নৌ-যাতায়াত ভাড়া কমার সম্ভাবনা তো ক্ষীণ, বরং সময়ে সেটা উচ্চ মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে পারে।

শেষ পর্ব (৩ আগষ্ট ২০২৬ প্রকাশিত)

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গুপ্তছড়া ঘাটকেন্দ্রিক আর্থিক কার্যক্রমে ছাত্রদল নেতা শহিদ ও তার ঘনিষ্ঠ অনুসারী আমিন রসুল এককভাবে নয়, বরং স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী একটি বলয়ের ছত্রচ্ছায়ায় কাজ করেছেন। একাধিক সূত্রের দাবি, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলমগীর ঠাকুরের সঙ্গে শহিদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তিনি ঠাকুরের বিশ্বস্ত অনুসারী হিসেবে পরিচিত। সহজ করে বললে শহিদ ও আমিন রসুল অনেকটা আলমগীর ঠাকুরের অন্ধকার জগতের সহযোদ্ধা।

অনুসন্ধানে উপজেলা বিএনপির আরেক নেতা হাসানুজ্জামান মামুন চেয়ারম্যানের (প্রকাশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অব সন্দ্বীপ) নামও এসেছে। কয়েকটি সূত্রের দাবি, একসময় কাউন্টার থেকে তার নামেও নিয়মিত অর্থ উত্তোলনের কথা বলা হতো। তবে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে মামুন চেয়ারম্যান প্রকাশ্যে দাবি করেন, তিনি এ ধরনের কোনো অর্থ গ্রহণ করেননি।

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, ঘাট থেকে সংগৃহীত অর্থের মাধ্যমে আলমগীর ঠাকুর ও মামুন চেয়ারম্যান দু’ভাবে বেনিফিশারি হয়েছেন। এক. প্রত্যক্ষ গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিদিষ্ট একটি পারসেন্টেজ গ্রহণ করে। দুই. কর্মীদের সম্মানির মাধ্যমে সাংগঠনিক প্রভাব ধরে রাখতে ব্যবহার করে, যা সন্দ্বীপের রাজনীতিতে ঘাট কেন্দ্রীক বা এর বাহিরে শহিদ ও আমিন রসুলের মাধ্যমে শক্ত একটা বলয় তৈরি করা যায়। উভয় ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছেন।

উপজেলা বিএনপির নেতাদের চাপের মুখে শহিদ এক পর্যায়ে স্বীকারও করে নিয়েছে, তাকে চাঁদাবাজি ও আত্মসাৎতের টাকার একটা নিদিষ্ট অংশ মামুন চেয়ারম্যান ও ঠাকুরের বলয়ে দিতে হয়েছে।

অন্যদিকে অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, দলীয় নেতাদের সঙ্গে একাধিক আলোচনায় শহিদ বলেছেন,

সব দোষ তো আমাকে দিলে হবে না। এই টাকা গুলো কি আমি একা হজম করেছি? আমাকে কি ঠাকুর ও মামুন চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করতে হয় নাই?

এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপি এক যুন্ম-আহ্বায়ক বলেন,

শহিদ এই টাকা একা হজম করার মতো ছেলে নয়। তাকে অবশ্যই ভাগ দিতে হয়েছে। সে গুপ্তছড়া ঘাট থেকে টাকা গুলো আকাশে উড়ায় দিতো। পরে ঠাকুরের কাছারিতে সেটা অবতণ করতো।

অনুসন্ধান আরো গভীরে যেতে চাই। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা থেকে বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট হওয়া যাবে।

ঘটনা–১: সাম্প্রতিক সময়ে গুপ্তছড়া ঘাটে সিমেন্ট বহনকারী একটি মালের বোটকে কেন্দ্র করে একটি ঘটনা ঘটে। জানা যায়, চট্টগ্রামের ডায়মন্ড কোম্পানি থেকে আনা ১ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট দিনের জোয়ারে সন্দ্বীপ উপকূলে পৌঁছায়। খালে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় রাতের জোয়ারের অপেক্ষায় বোটটি নদীর কূলে নোঙর করে রাখা হয়। সিমেন্টগুলো তালতলীর রিপন চেয়ারম্যানের বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বোটটির মালিক ছিলেন তালতলীর মোবারক ও ইয়াসিন সওদাগর।

অভিযোগ রয়েছে, বোটে অবৈধ মালামাল রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে শহিদ ও আমিন রসুলের নেতৃত্বে প্রায় ২০ জনের একটি দল রাতে বোটটি আক্রমণ করে। এ সময় বোটে থাকা ছয়জনকে প্রচুর মারধর করা হয়। আহত কয়েকজনকে পরে সন্দ্বীপের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, মেঘনা অয়েল কোম্পানি থেকে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা পাঁচ ড্রাম তেল বোট থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিটি ড্রামের মূল্য ছিল ২২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকার তেল নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তীতে এসব তেল ঘাটে থাকা বলগেট চালকদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

এছাড়া পুরো বোটটি আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বোট ছাড়াতে পরদিন আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে সন্দ্বীপ কমপ্লেক্সের ইসলামী ব্যাংক থেকে নগদ ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করে বোটের সেরাং (মাঝি) ঘাটসংলগ্ন কেরবা বা কেওড়া বাগানে শহিদ ও আমিন রসুলের হাতে তুলে দেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থের একটি অংশ আলমগীর ঠাকুর ও মামুন চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছায়। এ বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কাজ চলমান রয়েছে।

ঘটনা–২: ১৫ মার্চ রাত ১০টার দিকে এনাম নাহার মোড়ে আড্ডা ক্যাফেতে সুমন নামে এক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, শহিদের ঘনিষ্ঠ আমিন রসুলের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি এ হামলায় অংশ নেয়।

অনুসন্ধান টিমের হাতে আসা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ক্যাফের ভেতরে বসে থাকা সুমনকে মারধর করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারালে তাকে আলমগীর ঠাকুরের বাড়ির সামনের কাচারিতে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সূত্রগুলোর দাবি, তাজ ইটভাটায় ব্যবহৃত একটি ভেকু মেশিনের ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে এই ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগ অনুযায়ী, পাওনা ভাড়া না পেয়ে সুমন মেশিনটি ইটভাটা থেকে নিয়ে আসেন। এরপর সৃষ্ট বিরোধের জেরে তার ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ঘটনা–৩: ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন তাজ ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ আলমগীর ঠাকুর, মামুন চেয়ারম্যান ও শহিদ গংয়ের হাতে যায়।

৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মগধরা ইউনিয়ন পরিষদ ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য তাজ ইটভাটার ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করে, যেখানে মালিক হিসেবে আনোয়ার হোসেনের নাম উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ২৪ জুলাই ২০২৬ ঘোষিত সন্দ্বীপ ইটভাটা মালিক সমিতির কমিটিতে মামুন চেয়ারম্যান সভাপতি, শহিদুল ইসলাম শহিদ সাংগঠনিক সম্পাদক এবং আলমগীর ঠাকুর সদস্য নির্বাচিত হন। এ বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনা–৪: ২২ এপ্রিল ২০২৬ সন্দ্বীপ উপজেলা ইউএনও কার্যালয়ে স্পিডবোট ভাড়া নির্ধারণসংক্রান্ত একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, স্পিডবোট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আদিল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জগলুল হোসেন নয়ন, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় স্পিডবোট মালিকপক্ষ জনপ্রতি ৩৫০ টাকা ভাড়া প্রস্তাব করলেও উপস্থিত অনেকেই ২৫০ থেকে ২৮০ টাকার মধ্যে ভাড়া নির্ধারণের পক্ষে মত দেন। আলমগীর ঠাকুর মাঝখান থেকে স্পিডবোট ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দেন। শুধু প্রস্তাব দিয়ে বসে থাকেন নি, বরং ইউএনওকে তার প্রস্তাবিত ভাড়া নির্ধারণে ডিসির বরাবর সুপারিশ করতে রীতিমতো চাপ প্রয়োগ করেন। অনেকটা নিজের একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন সন্দ্বীপবাসীর উপর। এই সিদ্ধান্তকে সন্দ্বীপের মানুষ ঠাকুরের মঞ্চত্ব নাটক বলে অবহিত করেন। কেননা এই প্রস্তাবনা সম্পূর্ণ রুপে স্পিডবোট মালিকের পক্ষে ছিলো, যা ঠাকুরদের পরিকল্পনাতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন সচেতন মহল ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।

চাঁদাবাজি ও অর্থ আত্মসাৎতের বিষয়ে অনুসন্ধান টিম ইজারাদার জগলুল নয়নের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন,

এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না। আমি চাই ব্যবসাটা চালিয়ে নিতে। তখন যা হয়েছে সেটা ছিলো ব্যবসায় ইনভেস্টমেন্ট। টাকা গুলো সম্মানি বাবদ দেওয়া হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইয়েন না।

অভিযোগের বিষয়ে আলমগীর ঠাকুর, মামুন চেয়ারম্যান, শহিদুল শহিদ ও আমিন রসুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে এই বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তারা মেসেজ সিন করে কোনো রেসপন্স করেননি।

হোটেল জামানের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে আহ্বায়ক এড.আবু তাহেরকে শহিদ ও আমিন রসুলকে নিয়ে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী শনিবারে সবাইকে নিয়ে আবার বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত হলেও বিএনপি নেতারা এই বিষয়ে একেবারে চুপ হয়ে যায়। কেন এবং কি কারণে এমনটা হয়েছে তা স্পষ্ট করা যায়নি। এই বিষয়ের সাথে আর্থিক ভাবে এড. আবু তাহের ও ইঞ্জি. বেলায়েত হোসেন জড়িয়েছেন কি না তা পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যাবে।

তবে বৈঠক না হলেও জগলুল নয়নকে শহিদ ও আমিন রসুলের বিরুদ্ধে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। জগলুল নয়ন মামলা সিদ্ধান্ত নিলে আলামগীর ঠাকুরের হস্তক্ষেপে নয়ন কোম্পানি মামলা করা থেকে বিরত থাকেন। এরপর থেকে চাঁদাবাজি আর অর্থ আত্মসাৎতের বিষয়টি অন্ধকারে ঢাকা পরে যায়।

শহিদের চাঁদাবাজি এখনো শেষ হয়নি। এই ঘটনার পরও মাস খানেক আগে গুপ্তছড়া টিকেট কাউন্টার থেকে আবারও শহিদ ৫০ হাজার টাকা নেয়। ভবিষ্যতেও এমন কাজ অব্যাহত থাকবে কি না সেটা সময়ে উপর ছেড়ে দিয়ে এবারের মতো অনুসন্ধান শেষ হল।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *