সন্দ্বীপের হাটবাজার, চায়ের দোকান-সর্বত্রই আলোচনার বিষয় এখন কে পাবেন ধানের শীষের টিকিট। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে চায়ের কাপে ঝড় তোলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এককালে বিএনপির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে দলটি। মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, চরিত্রহনন ও আধিপত্যের লড়াইয়ে দলে বিভাজন স্পষ্ট। সংঘর্ষ, খুন ও মামলা-মোকদ্দমায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী আগেভাগেই মাঠে নেমেছে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আমির আলাউদ্দিন সিকদারকে প্রার্থী ঘোষণা করে তারা ইতোমধ্যে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন এবং ঘরে ঘরে জনসংযোগ শুরু করেছে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিশাল ভোটফারাক থাকলেও দুই দশকে জামায়াত এখন সন্দ্বীপে উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক অবস্থান গড়ে তুলেছে।
সন্দ্বীপে বিএনপিকে শৃঙ্খলায় আনতে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে সাক্ষাৎকারের ডাক পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন ও তারিকুল আলম তেনজিং, চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, সাবেক সংসদ-সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবু তাহের, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামাল পাশা বাবুল এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক রফী উদ্দিন ফয়সাল। প্রচারণা ও সমর্থনে এগিয়ে আছেন মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন ও ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন। মিল্টনের রয়েছে প্রবাসী ও তরুণ কর্মীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, আর বেলায়েত হোসেনের রয়েছে মাঠপর্যায়ের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতা।
মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির অনৈক্য ও সাংগঠনিক অস্থিরতা ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে-এ পরিস্থিতি কি জামায়াতের জন্য সুযোগ তৈরি করবে? এ বিষয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরেছেন। মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন বলেন,
বিএনপি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, এখানে মতভিন্নতা বা প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। তবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো সংঘাতে যেন আমরা না জড়াই। আমরা সেই নির্দেশনাই অনুসরণ করছি।
ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন,
আমরা সবাই ধানের শীষের কর্মী। দল যাকে প্রার্থী ঘোষণা করবে, তার পক্ষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব।
অন্যদিকে শারীরিক অসুস্থতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে সাবেক সংসদ-সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা এখন মাঠপর্যায়ে পিছিয়ে আছেন। দলের কঠিন সময়গুলোয় তার নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ও রাজনীতি থেকে অবসর ঘোষণার কারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তার প্রতি বিরূপ মনোভাব রয়েছে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সুযোগে তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মাস্টার শাহজাহানের সমর্থনে কামাল পাশা নির্বাচিত হন। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঘোষণা দিয়ে রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। সম্প্রতি আবারও মনোনয়ন পাওয়ার আশায় সক্রিয় হয়েছেন এবং মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় কমিটির অপর সদস্য তারিকুল আলম তেনজিং স্থানীয় পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত হলেও সম্প্রতি জনসংযোগ, প্রচার ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান মজবুত করছেন। এদিকে চলমান দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে থেকেও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবু তাহের নিজস্বভাবে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন,
দলের দুঃসময়ে যিনি পাশে ছিলেন, নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে কাজ করেছেন-এমন মানুষই দলের প্রকৃত প্রতিনিধি। মনোনয়ন বোর্ড এসব জানে, তারা নিশ্চয়ই যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
এখানে তিন দশকের বেশি সময় জাতীয় পার্টি নিষ্ক্রিয়। দেখা যাচ্ছে ইসলামি আরও কয়েকটি দলকে। নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জনসংযোগে বেশ সক্রিয়, আর ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আমজাদ হোসেন অল্প সময়েই এলাকাবাসীর কাছে পরিচিতি লাভ করেছেন।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে এবারের নির্বাচন হবে মূলত বিএনপি বনাম জামায়াতের লড়াই। বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। জামায়াতের ঘোষিত প্রার্থী আলাউদ্দিন সিকদার যুগান্তরকে বলেন,
জামায়াতে ইসলামীর জনবান্ধব কর্মসূচি ও সংগঠনিক শক্তি ভোটের ময়দানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে আশা করি।
সূত্র: যুগান্তর- চট্টগ্রাম ব্যুরো
