চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে এক ধর্ষণচেষ্টা মামলার ভুক্তভোগী নারীর পরিবার এখন উল্টো মামলার আসামি। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ভুক্তভোগীর শ্বশুর মোঃ হাশেম (৫০) কে বুধবার (৫ নভেম্বর) রাতে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি পুরো এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ অক্টোবর সন্দ্বীপ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মন্নান ট্যাক এলাকায় এক সৌদি প্রবাসীর স্ত্রী রেশমা আক্তার (২৯) কে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় একই বাড়ির মোঃ মহিন উদ্দিন (মঈন উদ্দিন) দুপুর ১২টার দিকে শাশুড়ি বাড়িতে না থাকার সুযোগে মহিন উদ্দিন ঘরে প্রবেশ করে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। ভুক্তভোগী নারী চিৎকার শুরু করলে পাশের ঘরে থাকা বৃদ্ধ দাদী শাশুড়ি সাড়া দিলে মহিন উদ্দিন দ্রুত পালিয়ে যায়।

ঘটনার পরদিন ২৬ অক্টোবর ভুক্তভোগী নারী সন্দ্বীপ থানায় মহিন উদ্দিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। এরপর ৪ নভেম্বর ওই মহিন উদ্দিনের স্ত্রী আয়শা আক্তার ভুক্তভোগী নারীর শ্বশুর মো. হাশেম আলীর বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন ও মারধরের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি পাল্টা মামলা (সিআর নং-৫০৫/২৫) দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ধর্ষণচেষ্টা মামলার পর মোঃ হাশেম বাদী আয়েশা আক্তার নিশা (২৩) ও তার পরিবারকে হুমকি ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। তার কাছ থেকে ২ ভরি ওজনের একটি সোনার হার ও নগদ ৩ লক্ষ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলেন ১নং আসামি মোঃ হাশেমের বিরুদ্ধে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে মোঃ হাশেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন, যার ভিত্তিতে বুধবার রাতে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, এই পাল্টা মামলা দায়ের ও পরবর্তী পদক্ষেপে উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং পুলিশ প্রশাসনের একাংশ যৌথভাবে একটি ‘সিন্ডিকেট’ করে বাদী আয়শা আক্তার নিশার পক্ষে কাজ করেছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আয়েশা আক্তার নিশার মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতেই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা একটি মেডিক্যাল সার্টিফিকেট (এমসি) প্রদান করেন, যা আইন অনুযায়ী বৈধ নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের সার্টিফিকেট প্রদানে আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন হয় এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষার্থে তা সংশ্লিষ্ট আদালত বা তদন্ত কর্মকর্তার নিকট হস্তান্তর করতে হয়। সেক্ষেত্রে তিন সদস্য বিশিষ্ট মেডিকেল বোর্ড কর্তৃক পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ছাড়া কোনো অবস্থাতেই এমসি প্রদান করা যাবে না। যদিও বিশেষ ক্ষেত্রে পুলিশ রেফারেন্স ছাড়াও ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য এমসি প্রদানের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু এই ঘটনায় মানস বিশ্বাস এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেননি। কেবল মৌখিক বক্তব্যের ভিত্তিতেই মেডিক্যাল সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে।
বাদীর তথ্য অনুযায়ী ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা জানান, উল্লিখিত দিনে এলাকায় এমন কোনো ঘটনার খবর তারা শোনেননি এবং ঘটনার সত্যতা সম্পর্কেও কিছু জানেন না।
বাদী আয়শা আক্তারের দাবি, তার ভাসুর মো. মাঈন উদ্দিন তাকে পরীক্ষা করানোর জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। এমসি সার্টিফিকেটে সনাক্তকারী হিসেবে মাঈন উদ্দিনের নাম উল্ল্যেখ থাকলেও, ইনসাইড টেলিভিশনের অনুসন্ধানে জানা যায়— মাঈন উদ্দিন উপজেলার কোন হাসপাতালে বাদীকে নিয়ে গিয়েছিলেন তা তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি।
এই বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানস বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে সার্টিফিকেট ইস্যুর বিষয়টি স্বীকার করেন। সার্টিফিকেট ইস্যু করার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
আমি সার্টিফিকেট দিয়েছি, কিন্তু টাকা নেওয়া যায় কি না সেটা জেনে তারপর আমাকে প্রশ্ন করুন।
বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র হতে জানা যায় যে, সন্দ্বীপ উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস এমসি সার্টিফিকেট প্রদান বাবদ ৩০০০ টাকা গ্রহণ করেছেন। এছাড়াও উক্ত মামলাটি দায়ের, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং আসামি গ্রেফতার করতে বাদীর কাছ থেকে উপজেলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ বেলাল হোছাইন ও সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ. কে. এম সফিকুল আলম যথাক্রমে ৫০,০০০ টাকা ও ২০,০০০ টাকা গ্রহণ করেছেন।
সন্দ্বীপ উপজেলার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ বেলাল হোছাইন এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি বলেন,
বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। তবে এখন কথা বলতে চাই না। সাংবাদিক হিসেবে আপনি চাইলে পরে অফিসে এসে দেখা করতে পারেন।
অন্যদিকে সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছেন, তাই আমরা অভিযুক্ত মোঃ হাশেমকে গ্রেফতার করেছি। ধর্ষণচেষ্টা মামলার আসামি মহিন উদ্দিনকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
শ্বশুর মোঃ হাশেমের গ্রেফতারের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রবাসী শিপন — যিনি ধর্ষণচেষ্টা মামলার বাদীর স্বামী — ফেসবুকে বিষয়টি প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
শুধু এই ঘটনা নয়, দীর্ঘদিন ধরে এই তিন অফিসারের বিরুদ্ধে ঘুষ, দূর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করে আসছে সন্দ্বীপের সাধারণ জনগণ। বিশেষ করে টাকার বিনিময়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মিথ্যা মামলা গ্রহণ ও জামিন প্রদান, থানার সাথে মাদক ব্যবসার সংপৃক্ততা ও অসহায় জনগণকে হয়রানি, এবং স্বাস্থ্য খাতে সীমাহীন অনিয়ম ও অফিসারের বেপরোয়া আচরণ, অর্থের বিনিময়ে মিথ্যা এমসি ইস্যু করা সহ ইত্যাদি উল্লেখ্যযোগ্য অভিযোগ ।

অনেকে মন্তব্যে লিখেছেন,
ধর্ষণচেষ্টার আসামি এলাকায় পার্টি দিচ্ছে, অথচ ভুক্তভোগী পরিবারের মানুষ জেলে — এটি ন্যায়ের পরিপন্থী।
এই ওসি শফিকুল ইসলাম যে কত বড় অসৎ, দুর্নীতিবাজ আর ঘুষখোর সেটা ভুক্তভুগীরা ছাড়া আর কেউ জানে না। সুন্দর চেহারার আড়ালে তার রুপ খুব ভয়ংকর।
মুহাম্মদ বেলাল হোসাইন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, এই লোকটা সন্দ্বীপের বিচার বিভাগকে পুরাই কলঙ্কিত করতেছে। কিছুদিন আগে আমার এক পরিচিত লোক মিথ্যা মামলায় যেদিন মামলা হয়েছে ঐদিনে ওয়ারেন্ট ইস্যু শুরু হয়ে গেছে। একটা লোকের বিরুদ্ধে মামলা হলে তাকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু, সন্দ্বীপে সেটা করা হয় না।। রাতের অন্ধকারে এরেস্ট করা হয়। যেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন।
ডাঃ মানস বিশ্বাস জন্ম নিবন্ধেনর জন্য প্রত্যয়ন পত্রে শুধুমাত্র একটা স্বাক্ষরের জন্য ১০০০/২০০০ টাকা করে নিচ্ছেন। সন্দ্বীপে যত ভুয়া মামলা হচ্ছে তার সবগুলো ডাঃ মানস বিশ্বাস এর ভুয়া সার্টিফিকেটে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এটি স্পষ্টভাবে একটি প্রভাবশালী মহলের ষড়যন্ত্র, যার মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় ও আইনি চাপে ফেলার চেষ্টা চলছে। তারা প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার ও প্রকৃত ধর্ষণচেষ্টা মামলার আসামি মো. মহিন উদ্দিনের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।
ধর্ষণচেষ্টা মামলার ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যের গ্রেফতার, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতায় সন্দ্বীপ এখন তীব্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন,
এ ঘটনায় শুধু একটি পরিবার নয়, বরং গোটা সমাজে আইনের প্রতি আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে। বিচার বিভাগে অনিয়ম, জুলুম ও অন্যায় হলে, মানুষের যাওয়ার অবশিষ্ট কোনো জায়গা থাকবে না।
নোট: পরবর্তী ধাপে তিন সরকারি কর্মকতার বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির বিষয়ে পৃথক প্রতিবেদন আসছে…
