‘সেফ এক্সিট জাতির দরকার, ব্যক্তির নয়’ — আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল

মুসাইব ইব্রাহিম, ডেস্ক রিপোর্ট

3 Min Read

রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর জাতীয় পরামর্শ সভায় আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে “সেফ এক্সিট” বা নিরাপদ প্রস্থান নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা কোনো ব্যক্তির জন্য নয়—বরং জাতির জন্য প্রয়োজন।

তিনি বলেন,

আমরা উপদেষ্টারা নিশ্চিতভাবে জানি, আমাদের কারও সেফ এক্সিটের দরকার নেই। কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের সেফ এক্সিট প্রয়োজন—কারণ ৫৫ বছর ধরে দুঃশাসন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা আর ভয়াবহ শাসনব্যবস্থার মধ্যে আমরা বাস করছি। এখন রাষ্ট্রকাঠামো থেকেই মুক্তির সময় এসেছে।

ড. আসিফ নজরুল আরও বলেন, ভালো আইন প্রণয়ন করলেই দেশ ভালো হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা এখন আর সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়,

ভালো আইন কেবল ভিত্তি তৈরি করে, কিন্তু যদি প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে, তাহলে সেই ভিত্তির ওপর টেকসই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না। ভালো আইন মানেই ভালো দেশ নয়; শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া আইনও ব্যর্থ হয়।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির হাতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হলেও, তা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।

সব সময় প্রধানমন্ত্রীদের ইচ্ছাতেই নিয়োগ হয়েছে। এমন অনেক প্রধান বিচারপতি ছিলেন, যাঁরা মানবাধিকার ধ্বংস ও গণতন্ত্র বিনাশে ভূমিকা রেখেছেন—এবং তাঁদের কেউ কেউ এখনো সক্রিয়,

বলেন তিনি।

সরকারের ভেতরে কাজ করতে গিয়ে তাঁর উপলব্ধি, দেশের শাসনব্যবস্থা এখনো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নয়, বরং ব্যক্তি-নির্ভর। “সবকিছুই এখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক। প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি,” যোগ করেন তিনি।

সাম্প্রতিক “সেফ এক্সিট” বিতর্ক প্রসঙ্গে ড. আসিফ নজরুল বলেন,

এই ধারণা নিয়ে অনেকের ভুল বোঝাবুঝি আছে। এটা কোনো ব্যক্তির নিরাপদ প্রস্থানের প্রসঙ্গ নয়, বরং জাতির জন্য নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয়তা।

এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের এক সাক্ষাৎকারে বলা হয়, সরকারের কিছু উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিজেদের নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন,

কারা সেফ এক্সিট নিতে চান, সেটা নাহিদ ইসলামকেই পরিষ্কার করতে হবে।

আর সেতু উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান মন্তব্য করেন,

বাহাত্তরোর্ধ্ব বয়সে যদি সেফ এক্সিটের কথা ভাবতে হয়, সেটা আমার জন্য অত্যন্ত দুঃখের।

আজকের সভায় উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা ছাড়াও শিল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।

সভায় আলোচকরা বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাঁরা মনে করেন, নতুন মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে এসব দিক সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা গেলে সেটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরানোর সুযোগ তৈরি করবে।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *