২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভারতীয় একজন কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠকের তথ্য স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক সময় পার করছে, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকের তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকার গঠনে সম্ভাব্য ভূমিকা রাখতে পারে—এমন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই চলতি বছরের শুরুতে তার সঙ্গে ভারতীয় একজন কূটনীতিকের সাক্ষাৎ হয় বলে জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের কূটনীতিকরা প্রকাশ্যেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও ওই ভারতীয় কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন। কেন গোপন রাখা হলো—সে বিষয়ে বিস্তারিত না বললেও, বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জামায়াত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানেই থাকতে চায়। কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ার নীতি জামায়াতের নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই এবং উন্মুক্ত যোগাযোগই উত্তেজনা কমানোর একমাত্র পথ।
ভারতের প্রসঙ্গ টানতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানের সঙ্গেও জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট করেন। বলেন, ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও জামায়াত কখনোই একতরফা অবস্থান নেয়নি; বরং সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মান ও ভারসাম্যের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় দলটি।
এই সাক্ষাৎকারে নির্বাচনী রাজনীতির প্রসঙ্গও উঠে আসে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জামায়াত এককভাবে সরকার গঠনে আগ্রহী নয়। বরং সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ গঠনের পক্ষে দলটি। তিনি জানান, ইতোমধ্যে কয়েকটি দলের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় প্রথম নির্বাচনে বিএনপির পর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার সম্ভাবনা তৈরি করেছে জামায়াতে ইসলামী। এতে দলটির মূলধারার রাজনীতিতে ফেরার ইঙ্গিত মিলছে। সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অংশ ছিল দলটি।
শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াত ছিল সরকারের কট্টর সমালোচক। তার সময়েই দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ২০১৩ সালে আদালতের রায়ে জামায়াতের সনদ সংবিধান পরিপন্থী উল্লেখ করে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০২৪ সালের আগস্টে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়।
এদিকে জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো সরকার রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে স্বস্তিবোধ করবে না বলেও মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সাহাবুদ্দিন। চলতি মাসের শুরুতে তিনি নিজেও রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেয়াদের মাঝপথে পদত্যাগে প্রস্তুত থাকার কথা বলেছিলেন।
তবে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। যদিও ভারত সরকারের একটি সূত্র বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
