ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে “এক কিডনির গ্রাম”: দারিদ্র্যের ফাঁদে পাচারের ভয়াল চক্র

মাইশা তাসনিম, ডেস্ক রিপোর্ট

3 Min Read

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের আশেপাশে চরম দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে এক ভয়ঙ্কর চক্র গরিব মানুষের কাছ থেকে কিডনি সংগ্রহ করছে। জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার বৈগুনি গ্রাম যেন এ সমস্যার প্রতীক হয়ে উঠেছে। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কারও না কারও কিডনি বিক্রির অভিজ্ঞতা রয়েছে, যার কারণে এলাকাটি “এক কিডনির গ্রাম” নামে পরিচিত হয়ে গেছে। শুক্রবার (৪ জুলাই) আল জাজিরার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন বাস্তবতার কথা উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের বিশাল চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশি দরিদ্র মানুষের অসহায়তাকে পুঁজি করছে এক দালালচক্র। ভারতে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষ কিডনি ফেলিওরের শিকার হন, অথচ মাত্র ১৩ হাজার ৬০০ জনের ট্রান্সপ্লান্ট হয়। এই বিশাল ঘাটতি পূরণেই গড়ে উঠেছে পাচারের অবৈধ নেটওয়ার্ক। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল গ্লোবাল হেলথের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কালাই উপজেলার প্রতি ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন কিডনি বিক্রি করেছেন। বৈগুনি গ্রামে বিশেষভাবে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে কিডনি বিক্রির হার বেশি। বেশিরভাগ মানুষই জানিয়েছেন, চরম দারিদ্র্যই তাদের এই পথে ঠেলে দিয়েছে। তবে অনেকেই ঋণ শোধ, মাদকাসক্তি কিংবা জুয়ার খরচ মেটাতেও কিডনি বিক্রি করেছেন।

প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে কালাই উপজেলার বৈগুনি গ্রামের ৪৫ বছর বয়সী সফিরউদ্দিনের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে তিনি ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভারতে কিডনি বিক্রি করেন। স্বপ্ন ছিল, এই অর্থ দিয়ে তিনি সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন। কিন্তু টাকা শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই, অসমাপ্ত রয়ে গেছে ঘরের নির্মাণকাজ। সফিরউদ্দিন বলেছেন, পরিবার ও সন্তানদের ভালোর জন্যই তিনি কিডনি বিক্রি করেছিলেন। তিনি আরও জানান, দারিদ্র্য ও অসহায়তা তাকে দালালদের প্রস্তাবে রাজি করায়। দালালরা তার জন্য ভিসা, বিমান টিকিট, ভুয়া নথিপত্র এবং হাসপাতালের কাগজপত্র তৈরি করে তাকে ভারতে নিয়ে যায়। সফিরউদ্দিন জানেন না, তার কিডনি কার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

সফিরউদ্দিনের মতোই অভিজ্ঞতা জোসনা বেগম এবং তার স্বামী বেলাল হোসেনের। তারা স্বল্পমূল্যে কিডনি বিক্রি করেছেন, কিন্তু অপারেশনের পর আর কোনো ধরনের চিকিৎসা বা ওষুধ পাননি। জোসনা বেগম বলেন, “আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। এখন সারাক্ষণ ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা আর ওষুধের খরচের চাপে ভুগছি।” ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, এই পাচার চক্রে ডাক্তার থেকে শুরু করে বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন দালাল জড়িত।

কিডনি পাচারকারী এক দালালের ভাষ্যমতে, কিডনি কেনার জন্য রোগীরা সাধারণত ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেন। অথচ যারা কিডনি দান করেন, তারা মাত্র ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পান। ভারতের আইনে কিডনি দান করা যায় কেবল ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে অথবা সরকারের বিশেষ অনুমতিতে। সেই কারণেই পাচারকারীরা ভুয়া আত্মীয়তার প্রমাণ, নকল নথি এবং জাল ডিএনএ রিপোর্ট তৈরি করে এই আইন এড়িয়ে যায়।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন,

ভারতের কোনো ধনী রোগীর কিডনি প্রয়োজন হলে দালালরা গরিব বাংলাদেশিদের খুঁজে বের করে এবং তাদের চাকরি বা আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে নিয়ে যায়। এই চক্র এভাবেই ঘুরতে থাকে।

কিডনি ওয়ারিয়র্স ফাউন্ডেশনের প্রধান বসুন্ধরা রঘুবংশ মনে করেন, কিডনির এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব না হলে অন্তত নিয়ন্ত্রিতভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সার্জারির পর চিকিৎসা সহায়তা এবং আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *