শাসনের অন্তরালে লুটপাট: ১৫ বছরের দুর্নীতির খতিয়ান

কাজী মাশিয়াত, ডেস্ক রিপোর্ট

7 Min Read
Highlights
  • আওয়ামীলীগ
  • শেখ হাসিনা

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক কিছু অর্জন থাকলেও, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে  অর্থণৈতিক সংস্কার বিষয়ক টাস্ক ফোর্স রিপোর্ট, নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রকাশিত শ্বেতপত্র ইত্যাদি প্রতিবেদনে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে  প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে অন্তত ২৮টি ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। শ্বেতপত্রে ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার, প্রকল্পের লুটপাট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিসংখ্যান ব্যবহারসহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সার্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। এতে মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ার শঙ্কার কথা বলা হয়েছে। ৩৯৭ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে সব মিলিয়ে ২২টি ক্ষেত্রে আলোকপাত করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, সরকারি ব্যয় (সরকারি বিনিয়োগ, এডিপি, ভর্তুকি ও ঋণ), ঘাটতি বাজেট অর্থায়ন, মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারি কেনাকাটা ও খাদ্য বিতরণ, রপ্তানি, আমদানি, প্রবাসী আয়, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদেশি অর্থায়ন।

শ্বেতপত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের আমলে ২০০৯ সাল থেক এ ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থাত, প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। ডলারপ্রতি ১২০ টাকা হিসেবে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা।

রোববার (১লা নভেম্বর) অর্থনীতি নিয়ে তৈরী শ্বেতপত্র প্রধান উপদেষ্টা্র নিকট হস্তান্তর করা হয় ।প্রতিবেদনটিতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে অর্থ পাচারের আনুমানিক এই চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরী করা হয় গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি রিপোর্টস (জিএফআইআরএস) এবং কিছু নির্দিষ্ট পূর্বানুমানের ভিত্তিতে। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি মনে করে, প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৪ শতাংশের পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ও প্রবাস আয় থেকে যত অর্থ এসেছে, এর এক-পঞ্চমাংশ পরিমাণ অর্থ এক বছরে পাচার হয়। বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ হিসেবে যত অর্থ আসে, এর দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ পাচার হয়।

এই অর্থ পাচারের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা,দুবাই, হংকং, সিঙ্গাপুর,মালয়েশিয়া ও ভারত। অর্থ পাচার সংক্রান্ত গবেষণা করে এমন কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন নিয়ে শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , এসব দেশে অর্থ পাচারের মাধ্যম ছিল বাড়ি ক্রয় এবং ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করা।২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত দুদকের অভিযানে ১৯২ একর জমি, ২৮টি ভবন ও ৩৮টি ফ্ল্যাট জব্দ করা হয়েছে, যেগুলো অবৈধ অর্থে অর্জিত।দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের ৫৩২টি বাড়ির বাজারমূল্য সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার।২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩৬০০ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ার “সেকেন্ড হোম” কর্মসূচির আওতায় মনোনীত হয়েছেন। এছাড়াও ২০২১ সালে ৮১৫ কোটি ডলার পাচারের তথ্য দিয়েছে  (Eutex Observatory)।

আওয়ামী শাসন আমলে ৮টি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যাতে ৭.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগ ওঠে। পদ্মা সেতু তৈরীর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১.২ বিলিয়ন ডলার যা বর্ধিত হয়ে রূপ নেয় ৩.৮৬ বিলিয়নে। পদ্মা রেল সেতুর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩.১০ বিলিয়ন ডলার যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪.৫০ বিলিয়ন ডলারে। এভাবে ৮টি মেগা প্রকল্পের প্রাক্কলিত বাজেট ১১.১২ বিলিয়ন থেকে পৌঁছায় ১৮.৬৪ বিলিয়ন ডলারে।

অন্যান্য খাতের মত রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে দূর্নীতি অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ডিফেন্স কর্পোরেশন (GDC) এর একটি প্রতিবেদন আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনে বলা হয় রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, পুত্র জয়, টিউলিপ সিদ্দিকী এবং আরও কিছু আত্নীয় স্বজনের আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার। যাতে উল্লেখ করা হয় মালয়শিয়ান ব্যাংকের মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাৎ এর কাজটি করে বৃটিশ মন্ত্রি টিউলিপ সিদ্দিকী। রাশিয়ার সাহাজ্যে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারিত হয় ১হাজার ২৬৫ কোটি ডলার।ধারণা করা হচ্ছে অর্থ আত্মসাৎ এর ঘটনায় রুশ প্রতিষ্ঠানটিও জড়িত ছিল।

প্রভাবশালী গোষ্ঠী দ্বারা ব্যাংক দখল, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।ব্যাংক খাতকে কৃষ্ণগহ্বরের (ব্ল্যাকহোল) সঙ্গে তুলনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওামি শাসন আমলে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে ব্যাংক খাতে। দেশের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে ২৪টি মেট্রোরেল বা ১৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত। গত ১৫ বছরে রাষ্ট্রীয় সংস্থার সহায়তায় ব্যাংক দখল,বড় অঙ্কের অর্থ দেশের বাইরে পাচার করার ফলে ব্যাংক খাত বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। শ্বেতপত্র প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ২৫-৩০ শতাংশে পৌঁছে যাবে। এসব ঋণের বড় অংশ ২০১৭ সালের পর দেওয়া হয়েছে।

বিগত সরকারের আমলে প্রতারণা, কারসাজি, প্লেসমেন্ট শেয়ার ও আইপিওতে জালিয়াতির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ১ ট্রিলিয়ন টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রভাবশালী উদ্যোক্তা গোষ্ঠী, ইস্যু ম্যানেজার, নিরীক্ষক ও বিনিয়োগকারীদের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মাধ্যমে কারসাজির একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। বাজারের মধ্যস্থতাকারী দেউলিয়া হয়েছে, তাদের ইক্যুইটি ৩০ হাজার কোটি টাকা নেতিবাচক।

সরকারি বিনিয়োগের জন্য  প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা ব্যায়ে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে। এই অর্থ সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ইত্যাদি খাতে ব্যয় হয়েছে। এ থেকে থেকে ঘুষ হিসেবেই দিতে হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি থেকে দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো।শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ ঘুষ নিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও তাদের সহযোগীরা।

প্রতিবেদনে এ নিয়ে বলা হয়, ঘুষের টাকার মধ্যে ৭৭ হাজার থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা গেছে আমলাদের কাছে। রাজনৈতিক নেতা ও তাদের সহযোগীদের কাছে গেছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর ঠিকাদারেরা দেশে ও বিদেশে এ অর্থ পৌঁছে দিয়েছেন রাজনীতিবিদ ও আমলাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে। তাদের বড় অংশ থাকেন বিদেশে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি ও জিডিপির তথ্য–উপাত্ত নিয়ে  শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন মতে বিগত সরকারের আমলে বিবিএসের পরিসংখ্যানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়েছে বলে মনে করেন শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্যরা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ করছাড় দেওয়া হয়েছে।

দুর্নীতি ও অর্থ পাচার দেশের সুশাসন, অর্থনীতি ও জনগণের আস্থায় ভয়াবহ আঘাত হেনেছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, TIB, GFI এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহিতার অভাব এবং দুর্বল নীতিমালা এই অবস্থার জন্য দায়ী। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *